ইসলামী ব্যাংকগুলোতে আমানত বেড়েছে ২৫ হাজার কোটি

দেশের ব্যাংক খাতে সংস্কার কার্যক্রম শুরুর পর ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর প্রতি গ্রাহকদের আস্থা কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে। এর প্রভাব পড়েছে আমানত প্রবাহেও। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এক বছরের ব্যবধানে দেশের পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত বেড়েছে প্রায় ২৫ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা। একই সঙ্গে এক মাসের ব্যবধানেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আমানত বৃদ্ধি পেয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ শেষে দেশের ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকের মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৮ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা। এর আগের বছর একই সময়ে, অর্থাৎ ২০২৪ সালের মার্চ শেষে এই ব্যাংকগুলোর মোট আমানত ছিল ৩ লাখ ৮৩ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত বেড়েছে ২৫ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা।

শুধু বার্ষিক ভিত্তিতেই নয়, মাসভিত্তিক হিসাবেও আমানত বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি শেষে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মোট আমানত ছিল ৪ লাখ ৬ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৮ হাজার ৫৪২ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, এক মাসের ব্যবধানে আমানত বেড়েছে ২ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা।

ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সংস্কারমূলক পদক্ষেপ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি জোরদারের কারণে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর প্রতি সাধারণ গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত মিলছে। বিশেষ করে যেসব ব্যাংক অতীতে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক বিতর্কে আলোচনায় ছিল, সেসব প্রতিষ্ঠানে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফেরার আভাস পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, ব্যাংক খাতে জবাবদিহিতা বাড়ানো, আর্থিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এবং পরিচালনা কাঠামোয় পরিবর্তনের কারণে গ্রাহকদের একাংশ আবারও ইসলামী ব্যাংকগুলোতে আমানত রাখতে আগ্রহী হচ্ছেন। ফলে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আমানতের প্রবাহ ইতিবাচক ধারায় রয়েছে।

তবে একই সময়ে নতুন করে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশকে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া এই অধ্যাদেশে একীভূত হওয়া দুর্বল ব্যাংকগুলোর সাবেক মালিক বা শেয়ারহোল্ডারদের পুনরায় মালিকানায় ফেরার সুযোগ রাখা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে গ্রাহক ও খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে এ কারণে যে, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া আর্থিক সহায়তার পুরো অর্থ পরিশোধ ছাড়াই মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জমা দিয়ে সাবেক মালিকদের আবারও ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফেরার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে অনেক গ্রাহকের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, অতীতে যাদের অনিয়ম ও আর্থিক দুর্বলতার কারণে কিছু ব্যাংক সংকটে পড়েছিল, তারাই আবারও পরিচালনায় ফিরে আসতে পারেন।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ইসলামী ব্যাংকগুলোর প্রতি গ্রাহকদের যে আস্থা ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হচ্ছিল, বিতর্কিত মালিকদের প্রত্যাবর্তনের সুযোগ থাকলে সেই আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কিছু গ্রাহক আমানত তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তও নিতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার অন্যান্য কার্যক্রমেও প্রবৃদ্ধির তথ্য উঠে এসেছে। প্রবাসী আয়, আমদানি বিল পরিশোধ এবং রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক, প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামিক শাখা এবং ইসলামিক উইন্ডোর মাধ্যমে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৬৩ কোটি ডলার। মার্চ মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৯ কোটি ডলারে। অর্থাৎ, এক মাসের ব্যবধানে প্রবাসী আয় বেড়েছে ৬ কোটি ডলার।

একই সময়ে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে আমদানি বিল পরিশোধের পরিমাণ ৮৫ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ৮৭ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। ফলে এক মাসে আমদানি বিল পরিশোধ বেড়েছে ২ কোটি ডলার।

এছাড়া ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে রপ্তানি আয়েও প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ফেব্রুয়ারিতে এই খাতে রপ্তানি আয় ছিল ৬০ কোটি ডলার, যা মার্চ শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১ কোটি ডলারে। অর্থাৎ, এক মাসে রপ্তানি আয় বেড়েছে ১ কোটি ডলার।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত, প্রবাসী আয়, আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রমে প্রবৃদ্ধি থাকলেও খাতটির ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে আস্থা পুনরুদ্ধার, সুশাসন এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর।