দি গার্ডিয়ান
প্রকাশ: ১৪ই জুলাই ২০২৬, ১:১৬ পিএম

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যে ব্যাপক তোড়জোড় শুরু করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তাঁর দাবি, এই আন্তর্জাতিক আদালত মার্কিন সামরিক বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য বড় হুমকি।
এই প্রচারণার অংশ হিসেবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এ মার্কো রুবিওর একটি দীর্ঘ মতামত নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত টহল বাহিনীর সদস্য ও নির্বাচিত নেতাদের আন্তর্জাতিক আদালতে টেনে নিয়ে যাওয়া হতে পারে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিচারকদের সামনে তাঁদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো হতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় রুবিও সতর্ক করে বলেন, মার্কিন প্রশাসন যদি এখন নিষ্ক্রিয় থাকে, তবে ভবিষ্যতে দেশের সীমান্ত ও নিরাপত্তা রক্ষা করার তথাকথিত অপরাধে মার্কিন নাগরিকদের হাজার হাজার মাইল দূরের বিদেশি বিচারকদের করুণার ওপর নির্ভর করতে হবে। যেকোনো সময় তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে, এমনকি হতে পারে কারাদণ্ডও।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, আইসিসিকে নিষ্ক্রিয় বা ভেঙে দেওয়ার জন্য মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যেসব দেশ আইসিসির সদস্য, তাদের ওপর আদালত ত্যাগ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের নানা ধরনের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, অথচ আইসিসির কথিত কর্তৃত্ব বর্জন করতে রাজি হবে না, তারা ওয়াশিংটনের কঠোর নজরদারির মুখে পড়বে। শাস্তি হিসেবে এসব দেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং ভিসা বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা রুবিওর এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বিভ্রান্তিকর বলে অভিহিত করেছেন। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাবেক নির্বাহী পরিচালক কেনেথ রথ স্পষ্ট করে বলেছেন, আইসিসি কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে সংঘটিত কোনো কর্মকাণ্ডের ওপর বিচারিক এখতিয়ার দাবি করেনি। রুবিও মূলত জাতীয় সার্বভৌমত্বের দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের দায়মুক্তির চেষ্টা করছেন। তিনি অন্য রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব ভূখণ্ডে সংঘটিত অপরাধের বিচার পাওয়ার সার্বভৌম অধিকারকে পুরোপুরি উপেক্ষা করছেন।
নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) মূলত ২০০২ সালে রোম চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। আইসিসি কেবল সেই সব দেশে সংঘটিত অপরাধের তদন্ত ও বিচার করতে পারে, যারা এই চুক্তিতে স্বাক্ষর ও অনুমোদন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত এই চুক্তি অনুমোদন করেনি, ফলে মার্কিন ভূখণ্ডে আইসিসির কোনো আইনি এখতিয়ার নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসন আসলে যেসব দেশ আইসিসির বিচারিক এখতিয়ার মেনে নিয়েছে, সেসব দেশের মাটিতে মার্কিন সেনাদের যেকোনো ধরনের যুদ্ধাপরাধের দায় থেকে বাঁচানোর পথ খুঁজছে।
মজার বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র নিজের স্বার্থ অনুযায়ী আইসিসির ভূমিকাকে মূল্যায়ন করে। যেমন, রোম চুক্তির অন্তর্ভুক্ত দেশ ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের পর সেখানে কথিত যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু করায় আইসিসির পদক্ষেপকে ট্রাম্প প্রশাসন স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু আইসিসির প্রধান কৌঁসুলি করিম খানের নেতৃত্বাধীন দপ্তর যখন ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরু করে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বদলে যায়। ফিলিস্তিন আইসিসির সদস্য হওয়ায় আদালত সেখানে তদন্ত পরিচালনা করে এবং এর অংশ হিসেবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, আইসিসি যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে অবৈধ ও ভিত্তিহীন পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর জের ধরে ট্রাম্প প্রশাসন আইসিসির প্রধান কৌঁসুলি করিম খান, তাঁর দুই উপপ্রধান এবং ছয়জন বিচারকের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পরবর্তীতে এই নিষেধাজ্ঞার পরিধি আরও বাড়িয়ে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রানচেসকা আলবানিজ এবং ইসরায়েলের সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ সংগ্রহে যুক্ত তিনটি ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংগঠনের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে মার্কো রুবিওর আইসিসিকে ‘ভেঙে দেওয়ার’ এই নতুন অঙ্গীকার ও হুমকি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কতটা কার্যকর হবে এবং আদালতের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে ঠিক কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে এখন নানা সমীকরণ চলছে।
মন্তব্য