খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ই জুলাই ২০২৬, ১২:৫৩ পিএম

বাংলাদেশের স্থাপত্যশিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পেছনে যে মানুষটির অবদান সবচেয়ে বেশি, তিনি স্থপতি মাজহারুল ইসলাম। এ দেশের আধুনিক স্থাপত্যচর্চার এই পথিকৃৎ কেবল একজন সফল স্থপতিই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একাধারে নগর পরিকল্পনাবিদ, প্রগতিশীল চিন্তক, সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিত্ব এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন একনিষ্ঠ সংগঠক। আজ ১৪ জুলাই এই কীর্তিমান মানুষের প্রয়াণ দিবস। ২০১২ সালের এই দিনে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর অনন্য কর্মজীবন ও এ দেশের স্থাপত্যে তাঁর রেখে যাওয়া অসামান্য অবদান আজ আবারও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে জাতি।
১৯২৩ সালের ২৫ জুলাই অবিভক্ত বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন মাজহারুল ইসলাম। তাঁর বাবা ওমদাতুল ইসলাম ছিলেন কৃষ্ণনগর কলেজের গণিতের শিক্ষক। বাবার শিক্ষকতার সুবাদে মাজহারুল ইসলামের শৈশবের পড়াশোনা শুরু হয় কৃষ্ণনগর কলেজ স্কুলে। সেখানে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর বাবার বদলির কারণে তাঁদের পরিবার রাজশাহীতে চলে আসে। এরপর তিনি রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং রাজশাহী কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরবর্তী সময়ে রাজশাহী কলেজ থেকেই পদার্থবিজ্ঞানে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। বিজ্ঞানের ছাত্র হলেও ভবনের নকশা ও নির্মাণের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল শৈশব থেকেই। আর সেই আগ্রহ থেকেই তিনি শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমান আইআইইএসটি, শিবপুর) প্রকৌশলবিদ্যায় ভর্তি হন এবং ১৯৪৬ সালে শিক্ষা জীবন সম্পন্ন করেন।
দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলার সরকারি নির্মাণ বিভাগে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন মাজহারুল ইসলাম। তবে সাধারণ প্রকৌশলবিদ্যার চেনা গণ্ডির মধ্যে তিনি নিজেকে আটকে রাখতে চাননি। স্থাপত্যশিল্পকে জীবনের মূল ব্রত হিসেবে বেছে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে ১৯৫০ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং অরিগন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্যবিদ্যায় ভর্তি হন। সেখান থেকে ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফেরার পর তিনি তাঁর মেধার প্রথম বড় স্বাক্ষর রাখেন। মাত্র ছয় মাসের নিরলস পরিশ্রমে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট (বর্তমান চারুকলা অনুষদ) এবং কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি ভবনের নকশা তৈরি করেন। স্থানীয় জলবায়ু, আলো-বাতাস, চারপাশের প্রকৃতি ও বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে আধুনিক স্থাপত্যের যে মেলবন্ধন তিনি এই নকশায় ঘটিয়েছিলেন, তা আজও এ দেশের স্থাপত্যের ইতিহাসে এক মাইলফলক হয়ে আছে।
পড়াশোনার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল আজীবন। ১৯৫৬ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিলের বৃত্তি নিয়ে তিনি লন্ডনের প্রখ্যাত এএ স্কুল অব আর্কিটেকচার থেকে ‘ট্রপিক্যাল আর্কিটেকচার’ বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা নেন। এরপর ১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বখ্যাত স্থপতি পল রুডলফ-এর অধীনে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। ১৯৬১ সালের শেষ দিকে দেশে ফিরে তিনি আবারও সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। তবে সরকারি দপ্তরের আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ও স্বাধীন চিন্তার পরিপন্থী পরিবেশের সঙ্গে তিনি মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। ফলে ১৯৬৪ সালে সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর প্রকৌশলী শেখ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সঙ্গে যৌথভাবে গড়ে তোলেন ‘বাস্তুকলাবিদ’ নামের একটি স্বাধীন স্থাপত্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের হাত ধরেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আধুনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থাপত্যচর্চার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের প্রথম সভাপতি হিসেবে এ দেশে স্থাপত্যকে একটি পেশা হিসেবে সুসংগঠিত করার মূল কৃতিত্ব মাজহারুল ইসলামের। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) স্থাপত্য অনুষদ প্রতিষ্ঠার পেছনেও তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। সেখানে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি নতুন প্রজন্মের স্থপতিদের মনের ভেতর মানবিক ও সমাজ সচেতন স্থাপত্যচিন্তার বীজ বুনে দিয়েছিলেন। শুধু নিজের কাজের মধ্যেই তিনি সীমাবদ্ধ ছিলেন না, দেশের স্বার্থে বিশ্বমানের কাজ উপহার দিতেও তিনি ছিলেন সদা তৎপর। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনের নকশা প্রণয়নের জন্য বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই আই কান-কে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানোর পেছনে মূল ভূমিকা ছিল মাজহারুল ইসলামেরই। তাঁর এই দূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণেই আজ ঢাকার বুকে বিশ্বস্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে।
মাজহারুল ইসলামের নকশায় নির্মিত প্রতিটি স্থাপনা এ দেশের আবহাওয়া, প্রকৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, স্থাপত্য কেবল ইট-পাথরের কোনো দেয়াল বা খাঁচা নয়; এটি হলো একটি জাতির সংস্কৃতি, ইতিহাস, জীবনবোধ ও স্বপ্নের এক শিল্পিত প্রকাশ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সরাসরি অংশ নেন এবং স্বাধীনতার পর দেশের যুদ্ধবিধ্বস্ত বিভিন্ন এলাকা পুনর্গঠনে ও নগর পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ২০১২ সালের ১৪ জুলাই এই মহান স্থপতির দীর্ঘ কর্মময় জীবনের অবসান ঘটলেও তাঁর রেখে যাওয়া সৃষ্টিশীলতা, দর্শন ও দূরদর্শী চিন্তাধারা এ দেশের তরুণ স্থপতিদের বুকে চিরকাল পথপ্রদর্শক হিসেবে বেঁচে থাকবে।
মন্তব্য