খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ই জুলাই ২০২৬, ২:৫০ পিএম

দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের শিল্প খাত নতুন করে গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, সরকারি সংস্থা এবং শিল্প উদ্যোক্তারা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান না হলে আগামী বছর থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে শিল্প উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে। পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে কয়েকশ শিল্পকারখানাকে উৎপাদন কমাতে কিংবা আংশিকভাবে কার্যক্রম সীমিত করতে হতে পারে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে কিছু কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এর প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থান, রপ্তানি, বিনিয়োগ, উৎপাদন ব্যয় এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
ইতোমধ্যেই দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। গাজীপুর, আশুলিয়া, টাঙ্গাইল, চন্দ্রা, রাজেন্দ্রপুর, ধনুয়া ও কোনাবাড়িসহ বিভিন্ন শিল্পবেল্টের বহু কারখানা প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস পাচ্ছে না। ফলে কোথাও উৎপাদন ধীরগতির হয়ে পড়েছে, কোথাও আবার কারখানাকে নির্ধারিত সময়ের আগেই উৎপাদন বন্ধ করতে হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
এই সংকট শুধু শিল্পেই সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের আবাসিক এলাকাতেও রান্নার গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ প্রতিদিন ভোগান্তির মুখোমুখি হচ্ছেন। অনেক এলাকায় দিনের নির্দিষ্ট সময়ে গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকে যে স্বাভাবিকভাবে রান্না করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ জানিয়েছেন, প্রতিদিনই গ্যাসের চাপ কমছে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে শিল্প, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক গ্রাহক—সব খাতেই সংকট আরও প্রকট হবে। তিনি বলেন, বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন ফোরামে তুলে ধরা হয়েছে এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রতিদিন অতিরিক্ত প্রায় ৭ কোটি ঘনফুট গ্যাস বরাদ্দ দেওয়ার পর শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ আরও কমে যায়। বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও এর ফলে শিল্প খাতের ওপর চাপ বেড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন পরিকল্পনা পুনর্বিন্যাস করতে বাধ্য হয়েছে।
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ২৬৫ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে প্রায় ১০৩ কোটি ২৩ লাখ ঘনফুট আসছে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকে। অর্থাৎ জাতীয় গ্যাস সরবরাহের বড় একটি অংশ এখন আমদানিনির্ভর, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্য বৃদ্ধি বা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
শুধু তিতাস গ্যাসের আওতায় শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্যাস সংযোগ রয়েছে সাড়ে চার হাজারেরও বেশি প্রতিষ্ঠানে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর মধ্যেই কয়েকশ কারখানা পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন সমস্যায় পড়েছে। নতুন শিল্প স্থাপনেও একই সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ডিমান্ড নোটের অর্থ জমা দেওয়ার পরও প্রায় ৫৫০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। আরও প্রায় ১ হাজার ৩০০টি নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আবেদন এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এই প্রায় ১ হাজার ৮০০ প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগ দিতে অতিরিক্ত ৪০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস প্রয়োজন হবে।
পেট্রোবাংলার পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী বছরের জুন নাগাদ দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ কমে প্রায় ২৬০ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুটে নেমে আসতে পারে। ২০২৮ সালে তা আরও কমে প্রায় ২৫৭ কোটি ঘনফুটে দাঁড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। অথচ একই সময়ে দেশের সম্ভাব্য গ্যাসের চাহিদা ৫০০ কোটি ঘনফুট ছাড়িয়ে যেতে পারে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বর্তমানে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হলেও সরকারি পূর্বাভাস বলছে, ২০২৮ সালের শেষে তা কমে প্রায় ৮৫ কোটি ঘনফুটে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে দেশীয় উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০২৯ সালের মধ্যে আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন অতিরিক্ত প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি ভোলাসহ বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রায় ২১ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে এসব প্রকল্পের অনেকগুলোর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
অন্যদিকে নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি। গত চার বছরে ২০টির বেশি কূপ খনন করেও অতিরিক্ত দৈনিক ৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সমুদ্রে নতুন তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, তবে অনুসন্ধান থেকে উৎপাদনে যেতে কয়েক বছর সময় লাগবে। ফলে তাৎক্ষণিক সংকট নিরসনে এই উদ্যোগের প্রভাব পড়বে না।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো দেশের প্রধান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর দ্রুত উৎপাদন হ্রাস। একসময় দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানায় দৈনিক প্রায় ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় ৭৪ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে তিতাস, হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ, মৌলভীবাজার, বাংগুরা ও সিলেট গ্যাসক্ষেত্রেও উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| দৈনিক মোট গ্যাসের চাহিদা | প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট |
| বর্তমান মোট সরবরাহ | ২৬৫ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট |
| এলএনজি থেকে সরবরাহ | ১০৩ কোটি ২৩ লাখ ঘনফুট |
| তিতাসের আওতায় শিল্প ও ক্যাপটিভ সংযোগ | সাড়ে ৪ হাজারের বেশি |
| গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান | প্রায় ৫৫০টি |
| নিষ্পত্তির অপেক্ষায় নতুন আবেদন | প্রায় ১,৩০০টি |
| নতুন সংযোগে অতিরিক্ত প্রয়োজন | ৪০ কোটির বেশি ঘনফুট |
| সম্ভাব্য সরবরাহ (আগামী বছরের জুন) | ২৬০ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট |
| সম্ভাব্য সরবরাহ (২০২৮) | প্রায় ২৫৭ কোটি ঘনফুট |
| সম্ভাব্য চাহিদা (২০২৮) | ৫০০ কোটি ঘনফুটের বেশি |
| বর্তমান দেশীয় উৎপাদন | প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুট |
| সম্ভাব্য দেশীয় উৎপাদন (২০২৮) | প্রায় ৮৫ কোটি ঘনফুট |
| পরিকল্পিত নতুন এফএসআরইউ সক্ষমতা | দৈনিক প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট |
| ভোলা ও অন্যান্য ক্ষেত্র থেকে পরিকল্পিত সংযোজন | প্রায় ২১ কোটি ঘনফুট |
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকট মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো, নতুন কূপ খননের গতি বৃদ্ধি, দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আমদানি ও দেশীয় উৎপাদনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। তা না হলে শিল্প উৎপাদনের পাশাপাশি রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাবের মুখে পড়তে পারে।
মন্তব্য