খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ই জুন ২০২৬, ৫:১২ পিএম

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. নুরুল আমিনের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের প্রকল্প সভাপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, টেস্ট রিলিফ (টিআর), কাবিটা ও কাবিখা কর্মসূচির একাধিক প্রকল্পে তাঁর ভাগ্নে, ভগ্নিপতি এবং অন্যান্য নিকটাত্মীয়দের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে প্রকল্প বণ্টনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরে সংসদ সদস্যের অনুকূলে টিআর খাতে ৩০ লাখ টাকা, কাবিটা কর্মসূচির জন্য ২৫ লাখ টাকা এবং কাবিখা কর্মসূচির আওতায় ৪০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব বরাদ্দের বিপরীতে টিআরের ১৪টি, কাবিটার ১১টি এবং কাবিখার ৫টিসহ মোট ৩০টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য দাখিল করা হয়েছে।
সরেজমিনে উপজেলার ৯ নম্বর সদর ইউনিয়নের তুলারামপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, এমপির বিশেষ বরাদ্দের আওতায় দুটি প্রকল্পের কাজ চলছে। এর একটি হলো কাবিখা কর্মসূচির অধীনে ১০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বরাদ্দে ইয়াকুব আলীর বাড়ির সামনে ওয়াক্তিয়া নামাজঘরের উন্নয়ন এবং পাশের মাঠে মাটি ভরাটের কাজ। এই প্রকল্পের সভাপতি করা হয়েছে ইয়াকুব আলীকে, যিনি সম্পর্কে সংসদ সদস্যের চাচাতো বোনের স্বামী।
একই গ্রামের আরেকটি প্রকল্পে ইয়াকুব আলীর বাড়ি থেকে মশফিকের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সলিং, পুকুরপাড়ে গাইডওয়াল নির্মাণ এবং মাটি ভরাটের কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাঁর ছেলে সালমান শরিফ শাওনকে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি সংসদ সদস্যের ভাগ্নে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি প্রকল্পে এমপির নিকট আত্মীয় ও দলীয় নেতা-কর্মীদের সভাপতি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মুকুল মিয়া বলেন, একই ওয়াক্তিয়া নামাজঘরের উন্নয়নের জন্য এর আগেও প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছিল। তাঁর প্রশ্ন, অল্প সময়ের ব্যবধানে আবারও একই স্থানে বরাদ্দ দেওয়া হলো কেন, এবং কেন সেই প্রকল্পের দায়িত্বও আত্মীয়দের হাতে তুলে দেওয়া হলো।
আরেক বাসিন্দা মঞ্জু মিয়ার অভিযোগ, গ্রামের পুরোনো জামে মসজিদের উন্নয়নের জন্য আবেদন করা হলেও সেটি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। তাঁর দাবি, প্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলো উপেক্ষা করে আত্মীয়দের সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোই অগ্রাধিকার পেয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্প সভাপতি ইয়াকুব আলী বলেন, প্রকল্পে কত টাকা বা কী পরিমাণ বরাদ্দ রয়েছে, সে বিষয়ে তাঁর কোনো ধারণা নেই। সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেই তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।
সংসদ সদস্য মো. নুরুল আমিনের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংক্ষেপে বলেন, “পরে কথা হবে।” এরপর তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আব্দুল আজিজ জানান, লিখিত বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান। তিনি বলেন, প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন না করে বরাদ্দের অর্থ বা সুবিধা গ্রহণের সুযোগ নেই। তদন্তে অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতির প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয় সরকার পরিচালিত টিআর, কাবিটা ও কাবিখা কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় ছোট ছোট প্রকল্প বাস্তবায়ন। এসব প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে পীরগঞ্জের এসব প্রকল্পে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ সামনে আসায় বরাদ্দ প্রক্রিয়া নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অভিযোগ উঠলেও এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো তদন্তে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হয়নি। ফলে বিষয়টি তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলো প্রমাণিত বলে গণ্য করার সুযোগ নেই।
মন্তব্য