মিরপুর চিড়িয়াখানায় সাদা মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’

রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত জাতীয় চিড়িয়াখানার নতুন অতিথি অ্যালবিনো জাতের বিরল সাদা মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ এখন দর্শনার্থীদের আকর্ষণের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী রঙের বিশেষ এই প্রাণীটির দৈনন্দিন পুষ্টি, খাবার-দাবার, স্বাস্থ্য ও সার্বিক পরিচর্যার বিষয়ে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বিশেষ সতর্কতামূলক নজরদারি রাখছে। প্রাণীটি যেন চিড়িয়াখানার নতুন পরিবেশের সাথে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে, সেজন্য তার প্রতিটি অভ্যাসের ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালানো হচ্ছে।

জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর আতিকুর রহমান এই আলোচিত মহিষটির দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেছেন। তিনি জানান, ডোনাল্ড ট্রাম্প নামের এই মহিষটি প্রতিদিন গড়ে ২৫ কেজি নেপিয়ার জাতের তাজা সবুজ ঘাস সাবাড় করছে। সবুজ ঘাসের পাশাপাশি তার সুষম পুষ্টি নিশ্চিত করতে দৈনিক পাঁচ কেজি করে পুষ্টিকর ছোলা ও ভুসির বিশেষ মিশ্রণ দেওয়া হচ্ছে। খাদ্য হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ পানির প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে প্রাণীটি প্রতিদিন প্রায় আধা মণ অর্থাৎ ২০ কেজি পানি পান করছে। গত বৃহস্পতিবারের মতো আজ শুক্রবারও তাকে সমপরিমাণ পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করা হয়েছে। কিউরেটর আরও উল্লেখ করেন যে, মহিষটির শারীরিক চাহিদা ও প্রয়োজন অনুসারে ভবিষ্যতে এই খাদ্য বরাদ্দের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি করা হতে পারে।

দৈনিক রুটিন, খাঁচার বিবরণ ও বিশেষ গোসল

গত বুধবার রাতে অলৌকিক ও বৈচিত্র্যময় বাহ্যিক cheharar এই সাদা মহিষটিকে মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানায় স্থানান্তর করার পর থেকেই তার জন্য নিবিড় যত্ন ও পরিচর্যা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। চিড়িয়াখানার নির্ধারিত দৈনিক রুটিন অনুযায়ী, প্রতিদিন সকাল ৯টার দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রথম দফায় ছোলা ও ভুসিজাতীয় দানাদার ও ভারী খাবার পরিবেশন করা হয়। এরপর বেলা ১১টার দিকে তাকে দেওয়া হয় প্রথম dalar সবুজ ঘাস। দুপুরের সাময়িক বিরতি শেষে বেলা ২টার পর তাকে দ্বিতীয় দফায় ঘাস খেতে দেওয়া হয় এবং বিকেল ৩টার দিকে দেওয়া হয় দিনের শেষ খাবার হিসেবে ছোলা-ভুসির মিশ্রণ। বিকেল ৩টার এই খাবারের পর প্রাণীটিকে রাতে আর কোনো ভারী খাবার দেওয়া হচ্ছে না।

বর্তমানে জাতীয় চিড়িয়াখানার ‘এল-০৭’ নম্বর সুনির্দিষ্ট খাঁচায় রাখা হয়েছে এই বিশেষ আকর্ষণীয় অতিথিকে। খাঁচার বাইরের মূল সীমানা প্রাচীরে তার পরিচিতি ফলকে বাংলা অক্ষরে স্পষ্ট করে ‘সাদা মহিষ (ডোনাল্ড ট্রাম্প)’ এবং নিচে ইংরেজিতে ‘অ্যালবিনো বাফেলো’ (Albino Buffalo) লিখে ঝুলিয়ে দিয়েছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। পাকা মেঝে আর ওপরে টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি এই খাঁচাটি বেশ বড় আকৃতির। এই খাঁচাটির ঠিক পাশেই রয়েছে একটি উন্মুক্ত খাঁচা, যেখানে একটি গয়াল আপন মনে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে গয়ালের মতো ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উন্মুক্ত বা খোলা না রেখে খাঁচার ভেতরে কিছুটা বেঁধে রাখা হয়েছে। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের দেওয়া ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই মহিষটি সম্পূর্ণ গৃহপালিত ও খামারের কৃত্রিম পরিবেশে ছোট থেকে বড় হওয়ায় এভাবে বেঁধে রাখাতেই সে বেশি অভ্যস্ত এবং স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। খাঁচার ঘরের কাছাকাছি একটি গাছ থাকলেও তীব্র দুপুরের কড়া রোদ ও তাপপ্রবাহের সময় তার ছায়া মহিষটির আশ্রয়ের ওপর পড়ে না। ফলে প্রচণ্ড গরম থেকে প্রাণীটিকে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিতে চিড়িয়াখানার নিয়োজিত কর্মীরা পাইপ দিয়ে দিনে দুই থেকে তিনবার তাকে নিয়মিত ঠান্ডা পানিতে গোসল করিয়ে দিচ্ছেন। কিউরেটর আতিকুর রহমান জানিয়েছেন, তীব্র তাপপ্রবাহের হাত থেকে প্রাণীটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় খুব শীঘ্রই খাঁচার ভেতরে একটি শক্তিশালী স্ট্যান্ডফ্যানের বিশেষ ব্যবস্থা করা হবে।

নিরাপত্তা দূরত্ব ও দর্শনার্থীদের ঢল

নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যগত নানাবিধ প্রোটোকল মেনে মহিষটিকে খাঁচার মূল লোহার সীমানা প্রাচীর থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ ফুট দূরত্ব বজায় রেখে ভেতরের অংশে বেঁধে রাখা হয়েছে। তবে এই অধিক দূরত্বের কারণে দূর-দূরান্ত থেকে প্রাণীটিকে দেখতে আসা দর্শনার্থীরা কিছুটা হতাশ হচ্ছেন এবং কাছ থেকে দেখতে না পাওয়ার আক্ষেপ প্রকাশ করছেন। পবিত্র ঈদুল আজহার দ্বিতীয় দিনেও ডোনাল্ড ট্রাম্প নামের এই সাদা মহিষটিকে একনজর সরাসরি দেখার জন্য চিড়িয়াখানার ওই খাঁচার সামনে মানুষের ব্যাপক ঢল ও ভিড় নামতে দেখা গেছে।

চিড়িয়াখানায় আসার নাটকীয় পটভূমি

খামার থেকে চিড়িয়াখানার ঠিকানা:

  • জন্ম ও নামকরণ: মূলত নারায়ণগঞ্জ শহরের পাইকপাড়া এলাকার জিয়া উদ্দিন মৃধার মালিকানাধীন ‘রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মে’ এই অ্যালবিনো মহিষটির জন্ম ও বেড়ে ওঠা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চুলের বিশেষ স্টাইলের সঙ্গে মহিষটির মাথার চুলের অদ্ভুত ও চমৎকার মিল থাকায় জিয়া উদ্দিনের ভাই শখ করে এর নাম রেখেছিলেন ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’।

  • গণমাধ্যমে প্রকাশ: গত ১২ মে ‘প্রথম আলো’ পত্রিকায় এই মহিষটিকে নিয়ে প্রথম সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।

  • উদ্ধার অভিযান: পরবর্তীতে কোরবানি দেওয়ার উদ্দেশ্যে কেরানীগঞ্জের জিনজিরা এলাকার বাসিন্দা মনিরুজ্জামান নামক এক ব্যক্তি বিপুল অর্থে মহিষটি কিনে নেন এবং গত সোমবার বিকেলে সেটিকে নিজের কেরানীগঞ্জের বাড়িতে নিয়ে যান। তবে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপকভাবে আলোচিত ও বিরল জাতের এই প্রাণীটির জিনগত ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব বিবেচনা করে ঈদের আগের দিন অর্থাৎ বুধবার বিকেলে স্বরাষ্ট্র मंत्रालयের সরাসরি বিশেষ নির্দেশনায় পুলিশ মনিরুজ্জামানের বাড়ি থেকে মহিষটিকে উদ্ধার করে।

  • স্থায়ী আবাসন: উদ্ধারের পর প্রথমে তাকে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় নেওয়া হলেও পরবর্তীতে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চূড়ান্তভাবে এই ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’-এর স্থায়ী ঠিকানা নির্ধারণ করা হয় মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানায়।