ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যে অগ্নিযুগের সূর্যসন্তানরা জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতার স্বপ্ন বুনেছিলেন, পুলিনবিহারী দাস ছিলেন তাঁদের অন্যতম অগ্রদূত। তিনি কেবল একজন বিপ্লবী নন, বরং ছিলেন দক্ষ সংগঠক, প্রশিক্ষক এবং অসীম সাহসের প্রতীক। ঢাকা অনুশীলন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তার অবদান অমর।
পুলিনবিহারী দাসের জন্ম ১৮৭৭ সালের ২৮ জানুয়ারি, শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার লনসিং গ্রামে এক শিক্ষিত ও সচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারে। পিতৃবংশে আইন ও প্রশাসনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক ছিল। তার পিতা নবকুমার দাস মাদারিপুর মহকুমার সাব-ডিভিশনাল কোর্টের উকিল ছিলেন। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও মুন্সেফ।
১৮৯৪ সালে ফরিদপুর জেলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। ছাত্রজীবনেই মেধা ও কর্মদক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়—কলেজের গবেষণাগারে ব্যবহারিক শিক্ষক হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
শৈশব থেকেই শরীরচর্চা ও লাঠিখেলার প্রতি তার প্রবল আকর্ষণ ছিল। কলকাতার সরলা দেবীর আখড়া দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯০৩ সালে ঢাকার টিকাটুলিতে নিজের আখড়া প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০৫ সালে লাঠিখেলায় দক্ষতা অর্জনের পর এটি বিপ্লবী প্রশিক্ষণের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে।
১৯০৬ সালে প্রমথ নাথ মিত্র ও বিপিন চন্দ্র পালের সঙ্গে দেখা তার জীবনে একটি ঐতিহাসিক মোড় আনে। প্রমথ নাথ মিত্রের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিদেশি শাসনের শৃঙ্খল ভাঙার সংকল্প নেন। একই বছরের অক্টোবর মাসে তিনি ঢাকায় ৮০ জন তরুণকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘অনুশীলন সমিতি’—যা অচিরেই বিপ্লবী আন্দোলনের শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হয়।
| বছর | ঘটনা | স্থান/প্রেক্ষাপট |
|---|---|---|
| ১৮৭৭ | জন্ম | লনসিং, নড়িয়া, শরীয়তপুর |
| ১৮৯৪ | ঢাকা কলেজে ভর্তি | ঢাকা |
| ১৯০৩ | আখড়া প্রতিষ্ঠা | টিকাটুলি, ঢাকা |
| ১৯০৬ | অনুশীলন সমিতি প্রতিষ্ঠা | ঢাকা |
| ১৯০৭ | বাসিল কপ্লেস্টন অ্যালেনের উপর হামলা | গোয়ালন্দ স্টেশন |
| ১৯০৮ | বরার জমিদার বাড়িতে ডাকাতি | নবাবগঞ্জ, ঢাকা |
| ১৯১০ | ঢাকা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার | সেলুলার জেল |
| ১৯১৯ | মুক্তি | – |
| ১৯৪৯ | মৃত্যুবরণ | – |
ঢাকায় তার প্রতিষ্ঠিত ‘ন্যাশনাল স্কুল’ ছিল প্রকৃতপক্ষে সশস্ত্র বিপ্লবী তৈরির প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। লাঠিখেলা, কাঠের তলোয়ার, ছোরা, এবং পরে পিস্তল ও রিভলভার—সবই ব্যবহার করা হতো স্বাধীনতার চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য।
পুলিনবিহারী দাসের নেতৃত্বে বিপ্লবীরা সাহসিকতার অসাধারণ নজির স্থাপন করে। ১৯০৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর বাসিল কপ্লেস্টন অ্যালেনকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়া, ভূপেশ চন্দ্র নাগসহ সহকর্মীদের সঙ্গে গ্রেপ্তার, ১৯১০ সালের ঢাকা ষড়যন্ত্র মামলা—সবই তার জীবনের দৃষ্টান্তমূলক অধ্যায়।
মুক্তির পরও তিনি বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকেন। দীর্ঘ সংগ্রামময় জীবনের পর ১৭ আগস্ট ১৯৪৯ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ইতিহাসের পাতায় পুলিনবিহারী দাস শুধুই নাম নয়—তিনি সাহস, আত্মত্যাগ ও সংগঠনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। অগ্নিযুগের এই বিপ্লবীর স্মৃতি চির অম্লান।
