,

১৫০ বছরের সুয়েজ খাল

বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত জলপথ সুয়েজ খাল এবার পা দিচ্ছে দেড়শ বছরে। লোহিত সাগরের সঙ্গে ভূমধ্যসাগরের সংযোগ স্থাপনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নিয়ে ১৮৫৯ থেকে ১৮৬৯ সাল পর্যন্ত এক দশকে খনন করা হয় খালটি। এই ১৫০ বছরের পথচলায় খালটি শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকে নয়, ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রেও বারবার বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়েছে।

সুয়েজ খাল

 

১৫০ বছরের সুয়েজ খাল

 

জন্মলগ্ন ও নির্মাণ প্রক্রিয়া

সুয়েজ খাল নির্মাণের পরিকল্পনা করেন ফরাসি কূটনীতিক ফার্দিনান্দ দে লেসেপস। তাঁর নেতৃত্বেই খনন কাজ শুরু হয়। খাল নির্মাণে অংশ নিয়েছিলেন প্রায় ১০ লাখ মিসরীয় শ্রমিক, যাদের অনেকেই মৃত্যুবরণ করেন নির্মাণকালে। নির্মাণসামগ্রী বহনে ব্যবহৃত হতো উট ও খচ্চর। ১৮৬৯ সালের ১৭ নভেম্বর, ১৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ খালটিতে প্রথম বাণিজ্যিক জাহাজ ভাসে।

 

সুয়েজ খাল

 

 

ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ও সংঘাত

১৯৫৬ সালের জুলাইয়ে খালের ইতিহাসে এক বড় বাঁক আসে। মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খালকে জাতীয়করণ করেন, যা ব্রিটিশ ও ফরাসি স্বার্থে আঘাত হানে এবং তীব্র আন্তর্জাতিক সংকট সৃষ্টি করে। তিন মাস পর ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েল একত্রে মিসরে আক্রমণ চালায়।

১৯৬৭ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত খালটি আরব–ইসরায়েল যুদ্ধের সরাসরি ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। ওই সময় খালটি অচল হয়ে পড়ে। এর ফলে বিশ্ব বাণিজ্যে বিরাট নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

 

সুয়েজ খাল

 

 

অর্থনীতি ও আধুনিকীকরণ

বর্তমানে সুয়েজ খাল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ১০ শতাংশ পরিবহন পরিচালনা করে। ২০১৫ সালে, প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল–সিসি খালের সমান্তরালে ৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন লেন উদ্বোধন করেন। এতে বড় আকৃতির মালবাহী জাহাজ সহজে পারাপার হতে পারে।

সুয়েজ ক্যানেল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী:

  • ২০১৮–১৯ অর্থবছরে খাল থেকে আয় হয় ৫৯০ কোটি মার্কিন ডলার
  • ২০২৩ সালের মধ্যে তা বাড়িয়ে ১,৩২০ কোটি ডলার করার পরিকল্পনা করা হয়
  • ২০২3 সালের আগস্টে, একদিনে সর্বোচ্চ ৮১টি জাহাজ ৬১ লাখ টন মালামাল পরিবহন করে

 

সুয়েজ খাল

 

️ নিরাপত্তা ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ

সুয়েজ ক্যানেল অথোরিটি বর্তমানে খাল পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। সিনাই উপদ্বীপের উত্তরাঞ্চলে চলমান ইসলামি জঙ্গি সংকট ও নিরাপত্তা হুমকির কারণে সেনাবাহিনী খালঘেঁষা এলাকাগুলোতে কড়া নজরদারি বজায় রাখে।

সুয়েজ খাল

 

️ ঐতিহাসিক মূল্যায়ন ও স্মরণ

ফরাসি রাষ্ট্রদূত স্টেফানে রোমাতেত বলেন, “সুয়েজ খাল নিয়ে সবাই নিজের মতো করে ইতিহাস লিখেছে।”
ফার্দিনান্দ দে লেসেপস স্মরণে মিসর ও ফ্রান্স যৌথভাবে ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে। খালের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে মিসরের ইসমাইলিয়া শহরে “সুয়েজ খাল: স্মৃতিময় স্থান” শীর্ষক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। একই শহরে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে সুয়েজ খালের ঐতিহাসিক জাদুঘর।

 

বর্ষপূর্তি আয়োজন

১৫০ বছর পূর্তির মতো মাইলফলক হলেও মিসর সরকার কোনো বড় উৎসব বা আয়োজনের পরিকল্পনা করেনি। বরং এই জলপথের ভূরাজনৈতিক বৈচিত্র্য, অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও অতীত সংঘাতগুলোকে স্মরণ করেই এই অধ্যায়কে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

 

google news
গুগোল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

সুয়েজ খাল কেবল একটি জলপথ নয়, এটি মিসরের ইতিহাস, আধুনিক রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির প্রতিচ্ছবি। গত ১৫০ বছরে এটি যেমন বিশ্ব বাণিজ্যের প্রাণরেখা হয়ে উঠেছে, তেমনি যুদ্ধ, সংকট ও রাজনৈতিক পুনর্গঠনেরও এক জীবন্ত ইতিহাস।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।