সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যু নিয়ে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা চলাবস্থায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আকস্মিক হামলা চালায় মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথবাহিনী। এই সামরিক পদক্ষেপের জবাবে পরবর্তী ৩৯ দিনে ইসরায়েল ভূখণ্ড এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে টানা ১০০ বার পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরান। এসব উপর্যুপরি হামলার কারণে যৌথবাহিনী চরম বেকায়দায় পড়লেও চলমান এই ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের মূল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র শেষ পর্যন্ত স্থানান্তরিত হয় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে।
Table of Contents
হরমুজ প্রণালির নৌ-অবরোধ ও ‘মশা নৌবহর’
পারস্য উপসাগরের এই সরু জলপথে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক তেলবাহী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের অজুহাতে গত ১৩ এপ্রিল ওই এলাকায় কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই সরু ও সংকীর্ণ জলপথে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিরক্ষার মূল শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে দেশটির অপ্রতিষ্ঠানিক ও অপ্রতিরোধ্য ‘মশা নৌবহর’। এগুলো মূলত আকারে ছোট এবং অত্যন্ত দ্রুতগতিসম্পন্ন অত্যাধুনিক সামরিক আক্রমণাত্মক স্পিডবোটের একটি বিশাল সমন্বিত বহর।
ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ডস কোরের (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর কাছে বর্তমানে ১০ টনের কম ওজনের এমন ১,৫০০টিরও বেশি ছোট ও মাঝারি আকারের আক্রমণকারী নৌযান রয়েছে। সামরিক কৌশলের দিক থেকে এই নৌযানগুলোর প্রধান লক্ষ্য ব্যক্তিগতভাবে টিকে থাকা নয়; বরং নিজেদের বিপুল সংখ্যার শক্তি ব্যবহার করে শত্রুপক্ষের ওপর একসঙ্গে চতুর্দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ব্যাপক ও বিধ্বংসী আক্রমণ সৃষ্টি করা।
এই বিশেষ স্পিডবোটগুলো ঘণ্টায় ৫০ থেকে সর্বোচ্চ ১১০ নট গতিতে সাগরে চলাচল করতে সক্ষম। এদের উচ্চ গতি এবং দ্রুত কৌশলগত দিক পরিবর্তনের সক্ষমতা শত্রুপক্ষের ওপর আক্রমণের সময়সীমাকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত করে দেয়। ফলশ্রুতিতে, মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ারগুলোতে থাকা অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তির রাডার এবং ফায়ার-কন্ট্রোল সিস্টেমগুলো এই সঙ্ঘবদ্ধ ও বিকেন্দ্রীকৃত আকস্মিক আক্রমণ প্রতিহত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। মূলত এই বিশেষ প্রযুক্তির স্পিডবোটগুলোর ওপর ভর করেই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে আইআরজিসি।
হেইদার-১১০: বিশ্বের দ্রুততম সামরিক নৌযান
২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ডস কোরের নৌবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে ‘হেইদার-১১০’ নামের একটি সম্পূর্ণ নতুন প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্রবাহী দ্রুতগতির সামরিক নৌকা উন্মোচন করে। এই বিশেষ নৌযানটির সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১১০ নট (প্রায় ২০৩ কিলোমিটার/ঘণ্টা), যা বর্তমানে এটিকে সমগ্র বিশ্বের দ্রুততম সামরিক নৌযানে পরিণত করেছে।
কাঠামোগতভাবে এই নৌযানটি প্রায় ১৪ মিটার দীর্ঘ এবং এটি নিজস্ব ডেকে দুটি আধুনিক অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে সক্ষম। এই দ্রুতগতির নৌযানের কার্যকর সামরিক রেঞ্জ বা কর্মক্ষমতার সীমা প্রায় ৩さと নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। এছাড়া হেইদার-১১০ নৌকাটি আধুনিক স্টেলথ বা রাডার-ফাঁকি দেওয়ার প্রযুক্তিতে তৈরি হওয়ার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠে শত্রুপক্ষের উন্নত রাডার ব্যবস্থায় একে সহজে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।
ইরানের ‘রেড ওয়াস্প’ বা লাল বোলতা বহর
ইরানের নৌবাহিনীতে বিভিন্ন শ্রেণির ও সক্ষমতার দ্রুতগতির নৌযান রয়েছে, যেগুলোকে সামরিক পরিভাষায় একত্রে ‘রেড ওয়াস্প’ বা লাল বোলতা বহর নামে অভিহিত করা হয়। এই বহরের অন্তর্ভুক্ত প্রধান নৌযানগুলো হলো:
আশুরা ক্লাস: এই শ্রেণির নৌকাগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠে সর্বোচ্চ ৯০ নট পর্যন্ত গতিতে ছুটতে পারে।
সেরাজ ক্লাস: নিখুঁত আক্রমণের ক্ষমতাসম্পন্ন এই নৌযানগুলোর সর্বোচ্চ গতি প্রায় ৬৫ নট।
তারেক ক্লাস: এগুলো ঘণ্টায় ৯০ নটেরও বেশি গতিবেগে শত্রুর ওপর আঘাত হানতে সক্ষম।
টন্দার ক্লাস: এই শ্রেণির নৌকাগুলো আকারে কিছুটা বড় এবং দূরপাল্লার ভারী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম।
মানববিহীন নৌযান (ড্রোন বোট): কোনো মানব ক্রু ছাড়াই দূর থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়ে নিখুঁত আত্মঘাতী বা দূরবর্তী আক্রমণ চালাতে পারে।
মার্কিন নৌ-শক্তির ওপর বড় চ্যালেঞ্জ
মধ্যপ্রাচ্যের এই ৪০ দিনের দীর্ঘ সামরিক সংঘাতের সময়ে এই ছোট ও মাঝারি নৌযানগুলো ব্যবহার করে মার্কিন নৌ-শক্তিকে পারস্য উপসাগরে ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয় ইরানের নৌবাহিনী। ইরানি সামরিক বাহিনীর এই বিশেষ নৌযানগুলো উপকূলবর্তী পাহাড়ের নিচে বিশেষভাবে তৈরি করা অত্যন্ত সুরক্ষিত ও গোপন সামরিক ঘাঁটি তথা কৃত্রিম গুহা থেকে হঠাৎ বের হয়ে আকস্মিক আক্রমণ চালাতে পারে। শত্রুর ওপর সফল আঘাত হানার পরপরই এগুলো পুনরায় দ্রুত গতিতে নিজেদের গোপন ঘাঁটিতে লুকিয়ে পড়তে সক্ষম। এই সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক ও কৌশলগত সুবিধার কারণে হরমুজ প্রণালির পূর্ণ সামরিক নিয়ন্ত্রণ নিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।
আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, পারস্য উপসাগরে ইরানের এই ছোট নৌযানের সংখ্যা এত বিপুল যে মার্কিন বাহিনীর পক্ষে একযোগে সবগুলো সনাক্ত বা ধ্বংস করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। মার্কিন সামরিক হেলিকপ্টার বা যুদ্ধজাহাজ আকাশ থেকে আক্রমণ চালিয়ে কিছু নৌকা ধ্বংস করতে পারলেও, ইরানের বিকেন্দ্রীকৃত সামরিক কমান্ড কাঠামোর কারণে তারা অতি দ্রুত সেই শূন্য স্থানে নতুন নৌকা ও সৈন্য মোতায়েন করতে সক্ষম হয়। এই প্রতিরক্ষামূলক কৌশলের কারণেই হরমুজ প্রণালির জলসীমায় মার্কিন নৌবহরকে কার্যকরভাবে প্রতিহত করে দিয়েছে ইরান।
