খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ই জুন ২০২৬, ৪:৩৮ পিএম

বাংলাদেশের সমাজসেবা, মানবকল্যাণ ও গান্ধীবাদী দর্শনের অন্যতম উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব ঝর্ণাধারা চৌধুরী। সারা জীবন তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন অসহায়, দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের কল্যাণে। ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে মানুষের সেবা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠাকেই তিনি জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর কর্মময় জীবন আজও মানবতার সেবায় নিয়োজিত মানুষদের অনুপ্রেরণার উৎস।
১৯৩৮ সালের ১৫ অক্টোবর লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার চণ্ডীপুর ইউনিয়নের কালুপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা ছিলেন বিশিষ্ট গান্ধীবাদী প্রমথ চৌধুরী এবং মাতা আশালতা চৌধুরী। শৈশব থেকেই পারিবারিক পরিবেশে মানবপ্রেম, সত্য, অহিংসা ও সেবার আদর্শে তিনি বেড়ে ওঠেন।
পিতার মৃত্যুর পর ১৯৫৬ সালে তিনি মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে প্রতিষ্ঠিত অম্বিকা-কালীগঙ্গা চ্যারিটেবল ট্রাস্টে (বর্তমান গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট) যোগ দেন। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ মানবসেবার পথচলা। পরে ১৯৬০ সালে চট্টগ্রামের প্রবর্তক সংঘে যোগ দিয়ে তিনি সমাজসেবা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয়ভাবে আত্মনিয়োগ করেন।
মানবসেবার পাশাপাশি শিক্ষাজীবনও তিনি অব্যাহত রাখেন। চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ঢাকা থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। জ্ঞান ও মানবিকতার সমন্বয়ে তিনি নিজেকে একজন আদর্শ সমাজকর্মী হিসেবে গড়ে তোলেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের আগরতলায় আশ্রয় নেওয়া লাখো শরণার্থীর জন্য ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
১৯৭৯ সালে তিনি পুনরায় গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টে ফিরে আসেন। ১৯৯০ সালের ১৩ জুন কিংবদন্তি সমাজসেবক চারু চৌধুরীর মৃত্যুর পর ট্রাস্টের সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুদ্রঋণ, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও গ্রামীণ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখে।
মানবকল্যাণে তাঁর অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার ২০১৩ সালে তাঁকে দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মশ্রী প্রদান করে। বাংলাদেশ সরকার ২০১৫ সালে তাঁকে একুশে পদক প্রদান করে তাঁর আজীবন মানবসেবার স্বীকৃতি দেয়। এছাড়াও তিনি দেশ-বিদেশে অসংখ্য সম্মাননা লাভ করেন।
২০১৯ সালের ২৭ জুন মানবতার এই নিবেদিতপ্রাণ সাধক পরলোকগমন করেন। কিন্তু তাঁর আদর্শ, ত্যাগ, মানবপ্রেম ও সেবামূলক কর্মকাণ্ড আজও অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছে। তাঁর কর্মজীবন আমাদের শেখায়—মানুষের জন্য নিবেদিত একটি জীবনই প্রকৃত অর্থে সফল জীবন।
আজ তাঁর প্রয়াণদিবসে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি এই মহান মানবদরদীকে।
বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি, ঝর্ণাধারা চৌধুরী।
মন্তব্য