,

বিদায়ী ম্যাচে মেসির শেষ কথা, ‘এই জার্সিটাই ছিল আমার জীবন’

একজন কিংবদন্তির ক্যারিয়ারে এমন একটি মুহূর্ত আসে, যখন দীর্ঘ পথচলার পর থামার সিদ্ধান্ত নিতে হয়। লিওনেল মেসির জন্য সেই মুহূর্তও এসে গেছে। আকাশি-সাদা জার্সিতে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে শেষবারের মতো মাঠে নামতে যাচ্ছেন তিনি। বুয়েনস এইরেসের ঐতিহাসিক মনুমেন্তালে বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের মধ্য দিয়ে জাতীয় দলের জার্সিতে তার ২১ বছরের অধ্যায়ের পর্দা নামছে।

বিদায়ী ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের উদ্দেশে আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন মেসি। দীর্ঘ সময় ধরে জাতীয় দলের হয়ে পাওয়া ভালোবাসা, সমর্থন ও স্মৃতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেছেন, শান্ত মনে বিদায় নেওয়ার সময় এসেছে। তার কথায়, তিনি সবকিছু দিয়ে চেষ্টা করেছেন এবং দেশের জার্সির প্রতি নিজের দায়িত্ব পালনে কোনো ঘাটতি রাখেননি।

বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোর ৫টায় শুরু হওয়ার কথা আর্জেন্টিনা ও বেনিনের ম্যাচটি। এর আগে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় মেসি নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ‘সময়টা এসে গেছে। এই জার্সিটাই ছিল আমার স্বপ্ন, আমার গর্ব, আমার জীবন। আমাকে এতটা ভালোবাসার জন্য ধন্যবাদ। তোমাদের খুব মনে পড়বে।’

মেসির জাতীয় দলের অধ্যায় শুরু হয়েছিল ২১ বছর আগে। এরপর আর্জেন্টিনার হয়ে তিনি খেলেছেন ২০৭টি ম্যাচ। করেছেন ১২৫ গোল এবং সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন ৬৬টি গোল। ম্যাচ, গোল ও অ্যাসিস্ট—তিন ক্ষেত্রেই আর্জেন্টিনার ইতিহাসে শীর্ষে রয়েছেন এই মহাতারকা।

তবে মেসির জাতীয় দলের অবদান কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা কঠিন। বছরের পর বছর আর্জেন্টিনার আক্রমণের মূল ভরসা হয়ে থাকা এই ফরোয়ার্ড দলকে নিয়ে গেছেন একাধিক বড় মঞ্চে। বিশ্বকাপেও তার উপস্থিতি ও অর্জন আলাদা করে আলোচিত। ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া বিশ্বের মাত্র কয়েকজন ফুটবলারের একজন তিনি।

২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপ দিয়ে শুরু হয়েছিল তার বিশ্বকাপযাত্রা। এরপর ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা, ২০১৪ সালে ব্রাজিল, ২০১৮ সালে রাশিয়া, ২০২২ সালে কাতার এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে খেলেছেন তিনি। ২০১৪ সালে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন। ২০২২ সালে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে জিতেছিলেন বিশ্বকাপ। এরপর ২০২৬ সালেও আবার ফাইনালের মঞ্চে উঠেছিলেন।

বিশ্বকাপেও মেসির গোলসংখ্যা তাকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলদাতাদের কাতারে রেখেছে। ছয়টি আসরে তার গোল ২১টি। সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় তার ওপরে রয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, যার গোলসংখ্যা ২২।

জাতীয় দলের হয়ে মেসির সাফল্যের তালিকা আরও দীর্ঘ। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি হলেও এর আগে ও পরে আর্জেন্টিনার হয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ ট্রফি জিতেছেন তিনি। ২০২১ ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ সালের ফিনালিসিমা তার সংগ্রহে রয়েছে। বয়সভিত্তিক পর্যায়েও রয়েছে সাফল্য—২০০৫ সালে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জয়ের পাশাপাশি ২০০৮ সালের অলিম্পিক ফুটবলে আর্জেন্টিনার হয়ে সোনার পদক জিতেছেন তিনি।

জাতীয় দলের শুরুটা অবশ্য এতটা মসৃণ ছিল না। মেসির ক্যারিয়ারের দীর্ঘ সময়জুড়ে আর্জেন্টিনার হয়ে শিরোপা না পাওয়ার হতাশা তাকে ঘিরে ছিল। একের পর এক বড় ম্যাচে ব্যর্থতা, ফাইনালে পরাজয় এবং সমালোচনার চাপের মধ্যেও তিনি জাতীয় দলের হয়ে খেলা চালিয়ে গেছেন। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে ২০২১ সালের কোপা আমেরিকায়। এরপর একে একে আসে ফিনালিসিমা, বিশ্বকাপ এবং আবার কোপা আমেরিকার শিরোপা।

মনুমেন্তালে বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি তাই শুধু আরেকটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি হয়ে উঠছে মেসির জাতীয় দলজীবনের স্মরণীয় বিদায়ী মুহূর্ত। ম্যাচের আগে ও পরে তাকে ঘিরে থাকছে নানা আয়োজন। ২০২২ সালের বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা দলের একাধিক সদস্যও উপস্থিত থাকবেন বলে জানানো হয়েছে।

আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কাছে মেসির বিদায় মানে শুধু একজন ফুটবলারের শেষ ম্যাচ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুই দশকের আবেগ, অসংখ্য স্মৃতি এবং একটি প্রজন্মের ফুটবল-অভিজ্ঞতা। আকাশি-সাদা জার্সিতে তার যাত্রায় যেমন ছিল হতাশা ও সমালোচনা, তেমনি ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা, একের পর এক বড় অর্জন এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জয়ের পূর্ণতা।

মেসির জন্য জাতীয় দলের পথচলার শেষ প্রান্তটি তাই অন্য যেকোনো বিদায়ের চেয়ে আলাদা। যে জার্সিকে তিনি নিজের স্বপ্ন, গর্ব ও জীবন বলে বর্ণনা করেছেন, সেই জার্সি গায়ে শেষবার মাঠে নামার মুহূর্তটি আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।