,

ফেনীতে সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি

ফেনীতে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দামে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। জেলার বিভিন্ন বাজারে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে একই ওজনের সিলিন্ডার ভিন্ন ভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের একাংশ সরবরাহ সংকট ও বেশি দামে সিলিন্ডার কেনার কথা বললেও ক্রেতাদের অভিযোগ, এর সুযোগ নিয়ে কোথাও কোথাও অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সর্বশেষ নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। তবে ফেনী শহর ও বিভিন্ন উপজেলার বাজার ঘুরে ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার টাকা বা তারও বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে।

ক্রেতাদের ভাষ্য, নির্ধারিত দামের বিষয়টি অনেক বিক্রেতা মানছেন না। কোথাও সিলিন্ডার পাওয়া গেলেও বেশি দাম দিতে হচ্ছে, আবার কোথাও পছন্দের কোম্পানির সিলিন্ডার না থাকায় একাধিক দোকানে ঘুরতে হচ্ছে। এতে রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর মাসিক ব্যয় আরও বাড়ছে।

ফেনী শহরের মাস্টারপাড়ার বাসিন্দা আবদুর রহমান বলেন, তিনি অল্প বেতনে চাকরি করেন এবং ছয় সদস্যের পরিবার নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন। সম্প্রতি ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার তাকে ২ হাজার টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে।

তার ভাষ্য, নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিয়ে প্রতিবার সিলিন্ডার কিনতে হলে সীমিত আয়ের পরিবারের পক্ষে সংসারের অন্যান্য খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।

একাডেমি সড়কের বাসিন্দা কানিজ ফাতেমাও এলপিজির বাড়তি দামে ক্ষোভ জানিয়েছেন। তার সংসার স্বামীর সীমিত আয়ের ওপর নির্ভরশীল। বাসায় লাকড়ির চুলা ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় রান্নার জন্য এলপিজি কিনতেই হয়। ফলে বাজারে দাম বাড়লে সরাসরি তার পরিবারের ব্যয়ে প্রভাব পড়ে।

ফেনী শহরের ট্রাংক রোডের চা-শিঙাড়ার দোকানি মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, বাড়তি দামে সিলিন্ডার কিনলেও তিনি খাবারের দাম বাড়াতে পারছেন না। তার দোকানে শিঙাড়া আগের মতোই ১০ টাকা দামে বিক্রি করছেন। দাম বাড়ালে ক্রেতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান তিনি।

ছাগলনাইয়ার নাছিরা দিঘী রাস্তার মাথার ব্যবসায়ী তারেকুল ইসলাম বলেন, মঙ্গলবার তিনি ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার পাইকারি পর্যায়ে ১ হাজার ৯০০ টাকা দরে কিনেছেন। তাই বাধ্য হয়ে সেটি ২ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। তার দাবি, ডিলাররা নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার সরবরাহ করলে খুচরা পর্যায়েও কম দামে বিক্রি করা সম্ভব।

জমাদ্দার বাজারের খুচরা বিক্রেতা আবুল কাসেম বলেন, গত দুই মাস ধরে তিনি বসুন্ধরা গ্যাসের সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। অন্য একটি কোম্পানির সিলিন্ডারও স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ২০০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। বেশি দামে কেনার কারণেই বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

তবে খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবির সঙ্গে ডিলার পর্যায়ের বক্তব্যে কিছুটা ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। ফেনীতে বসুন্ধরা গ্যাসের ডিলার মেসার্স রাসেল এন্টারপ্রাইজের ক্যাশিয়ার শাহাদাত হোসেন তারেক জানান, বিইআরসি নির্ধারিত ১ হাজার ৮৩৭ টাকার বিপরীতে কোম্পানি থেকে তাদের প্রতি সিলিন্ডার ১ হাজার ৯০০ থেকে ১ হাজার ৯৫০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। ফলে নির্ধারিত দামে বিক্রি করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।

তার দাবি, গ্রামাঞ্চলের কিছু খুচরা বিক্রেতা নিজেদের মতো করে দাম নির্ধারণ করছেন এবং প্রতি সিলিন্ডারে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত লাভ করছেন। একই সঙ্গে বাড়তি দাম দিয়েও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েকটি কোম্পানির সিলিন্ডার গত দুই মাস ধরে না পাওয়ায় বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে বলেও তিনি জানান।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) ফেনী জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, এলপিজির অতিরিক্ত দাম নেওয়া বন্ধ করতে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো দরকার। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত নিয়মিত বাজার তদারকি করা প্রয়োজন। মানুষের আয়-ব্যয়ের চাপের মধ্যে বাড়তি কয়েকশ টাকা দিয়ে রান্নার গ্যাস কেনা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ফেনীর সহকারী পরিচালক মো. আছাদুল ইসলাম বলেন, এলপিজির দাম নিয়ে নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে। নির্ধারিত দামের বেশি নেওয়ার বিষয়ে কোনো ভোক্তা অভিযোগ করলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি ভোক্তাদের অভিযোগ জানানোর পাশাপাশি বাজারে নির্ধারিত মূল্য সম্পর্কে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

ফেনীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহবুবউল করিম জানান, সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৮৩৭ টাকা দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করতে অভিযান চলছে। তবে জেলার ১৮ জন সাপ্লায়ার প্রশাসনকে জানিয়েছেন, তারা নিজেরাই নির্ধারিত দামে এলপিজি কিনতে পারছেন না। কোথাও ১ হাজার ৯০০ টাকা বা তারও বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে বলে তিনি জানান।

ফলে ফেনীর এলপিজি বাজারে এখন দুটি বিষয় পাশাপাশি সামনে এসেছে—একদিকে ভোক্তাদের কাছ থেকে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ, অন্যদিকে সরবরাহকারীদের দাবি, তারাই বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে সরবরাহব্যবস্থার কোথায় অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি হচ্ছে এবং খুচরা পর্যায়ে কত দামে বিক্রি হচ্ছে, তা কার্যকরভাবে তদারকি করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।