খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ই জুন ২০২৬, ৪:৪৭ পিএম

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌর শহরে মা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় এক রোমহর্ষক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ঘটনার মূল অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার (২৮) নিজেকে ‘জহির’ নামে মুসলিম পরিচয় দিয়ে ওই এলাকায় এক বছর ধরে বসবাস করছিলেন। কেবল তাই নয়, হত্যাকাণ্ডের সময় ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে নিজেকে কল ও পাইপলাইনের মিস্ত্রি হিসেবে জাহির করার চেষ্টাও করেছিলেন তিনি। তবে প্রতিবেশী এক নারীর উপস্থিত বুদ্ধি ও সাহসিকতার কারণে শেষ পর্যন্ত তিনি পালাতে পারেননি।
Table of Contents
বৃহস্পতিবার দুপুরে রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা এলাকার নদীর পাড়ের একটি ভাড়া বাসায় এই চার খুনের ঘটনা ঘটে। ওই ভবনের প্রতিবেশী আফরোজা বেগম জানান, ঘটনার কিছুক্ষণ আগে ঘরের ভেতর থেকে হঠাৎ ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ বলে আর্তচিৎকার শুনতে পান তিনি। চিৎকার শুনে জানালার পাশে দৌড়ে গিয়ে গৃহকর্ত্রী শাহিনুর বেগমকে ডাকতে থাকেন, কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাননি।
আফরোজা বেগম বলেন, “প্রথমে চিৎকার শুনছিলাম। পরে হঠাৎ সব চুপ হয়ে যায়। অনেকক্ষণ পর জানালা দিয়ে দেখি একজন রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছে। ভেবেছিলাম শাহিনুরের ছেলে সিফাত হয়তো। আমি সিফাত বলে ডাকলাম, কিন্তু তারও কোনো উত্তর পাইনি। কিছুক্ষণ পর লোকটি আড়াল হতেই জানালা বন্ধ করার শব্দ শুনি। তখনই আমার সন্দেহ বেড়ে যায়।”
সন্দেহ হওয়ায় আফরোজা জানালার কাছে গিয়ে দেখেন, ভেতরে অন্তরের হাতে একটি প্যান্ট। সেখানে থাকার কারণ জানতে চাইলে অন্তর নিজেকে কল ও পাইপলাইন মেরামতের মিস্ত্রি বলে দাবি করেন। আফরোজা জানান, যুবকের হাতে প্যান্ট দেখে বিষয়টি তার কাছে খুবই অস্বাভাবিক মনে হয়। তিনি ভাবেন, হয়তো শাহিনুর বাসায় নেই এবং মিস্ত্রি সেজে এসে মেয়েদের সঙ্গে কোনো অপরাধ করা হয়েছে।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আফরোজা কালক্ষেপণ না করে বাইরে থেকে বাসার মূল দরজা আটকে দেন এবং চিৎকার করে আশপাশের লোকজনকে ডাকেন। পরে প্রতিবেশীরা এসে ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই স্তব্ধ হয়ে যান। পুরো মেঝে জুড়ে তখন রক্ত আর রক্ত। সেখানে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল মা ও তিন মেয়ের নিথর দেহ।
এদিকে বাইরে লোকজনের জড়ো হওয়ার শব্দ পেয়ে ঘরের ভেতর আটকে পড়া অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার পালানোর জন্য ভবনের ছাদে উঠে যান। তবে স্থানীয় জনতা ধাওয়া করে তাকে ছাদেই ধরে ফেলেন এবং তীব্র গণপিটুনি দেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে গুরুতর আহত অবস্থায় অন্তরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা আড়াইটার দিকে তার মৃত্যু হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিহতদের বাড়ি কুমিল্লার হোমনা উপজেলায় হলেও গত ২৫-২৬ বছর ধরে তারা রায়পুরে ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন। নিহতের পরিবার ও স্থানীয়রা জানান, অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার দাসেরহাটের বাসিন্দা। তবে রায়পুরে তিনি নিজেকে মুসলিম পরিচয় দিয়ে জহির নামে এক নারীকে নিয়ে এক বছর ধরে বসবাস করছিলেন। স্থানীয়দের কেউ কেউ জানান, তিনি রায়পুর শহরে ভাসমান ফল বিক্রেতা হিসেবেও কাজ করতেন। শুক্রবার দুপুরে তার মরদেহ এক চাচাতো ভাই পুলিশের কাছ থেকে বুঝে নিয়েছেন।
নৃসংশ এই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন শাহিনুর বেগম (৩৮) এবং তার তিন মেয়ে সায়মা আক্তার (২০), ইকরা বেগম (১৭) ও সিপা (৯)। নিহতদের মধ্যে সায়মা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন এবং ইকরা রায়পুর কাজী ফারুকী কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। ছোট মেয়ে সিপা স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এই পরিবারের প্রধান কামাল হোসেন ২০১৯ সালে কেরোয়া গ্রামে রাস্তায় পড়ে থাকা তারে বিদ্যুৎস্পর্শে মারা যান। এরপর থেকে মা ও সন্তানেরা এই বাসায় থাকতেন।
একই পরিবারের চারজনকে এভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় রায়পুরসহ দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রছাত্রী কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে রাজু ভাস্কর্যের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ভয়াবহ এই ঘটনার পর তদন্তে নেমেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক দল। চট্টগ্রাম বিভাগীয় পুলিশের ডিআইজি মনিরুজ্জামান এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পুরো ঘটনাটি পুলিশ, সিআইডি এবং র্যাব যৌথভাবে তদন্ত করছে।
ঘটনার পর রায়পুর থানায় দুটি পৃথক হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহতদের একমাত্র বেঁচে যাওয়া ছেলে জিহাদুল ইসলাম শিফাত বাদী হয়ে মূল আসামি ও অজ্ঞাত সহযোগীদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেছেন। অন্যদিকে, অভিযুক্তকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা এবং তাকে বাঁচাতে গিয়ে ৭ পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার ঘটনায় এসআই আমিনুল ইসলাম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে আরেকটি মামলা করেছেন। দুটি মামলারই তদন্ত করছেন রায়পুর থানার ওসি (তদন্ত) মো. আবদুল মান্নান।
রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া জানান, ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি রক্তমাখা দা আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, একজনই এই পুরো হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছেন। তবে হত্যার মূল কারণ এখনও পরিষ্কার নয়। এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য বা সহযোগী রয়েছে কি না, তা বের করতে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে। ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার দুপুরে মা ও তিন মেয়ের মরদেহ ছেলে শিফাতসহ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
মন্তব্য