স্বামী তৌফীক নাওয়াজের জানাজায় অংশ নিতে ১২ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়েছেন আওয়ামী লীগের নেত্রী ও সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি। বৃহস্পতিবার সকালে কঠোর পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে তাকে মুন্সীগঞ্জ কারাগার থেকে ঢাকায় আনা হয়। স্বামীর মৃত্যুর পর পরিবারের পাশে থাকার পাশাপাশি শেষবারের মতো তার জানাজায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
সকাল ৬টা ১৫ মিনিটের দিকে মুন্সীগঞ্জ কারাগার থেকে দীপু মনিকে ঢাকার উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা পর সকাল সোয়া ৮টার দিকে পুলিশি পাহারায় তিনি কলাবাগানের বাসায় পৌঁছান। সেখানে পরিবারের সদস্য, স্বজন ও ঘনিষ্ঠ পরিচিত কয়েকজন আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন। দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গীকে হারানোর শোকের মধ্যে কিছু সময় পরিবারের সঙ্গে কাটান তিনি।
এর কিছুক্ষণ পর তৌফীক নাওয়াজের মরদেহও কলাবাগানের বাসায় নেওয়া হয়। বাসার নিচের গ্যারেজে একটি ফ্রিজার ভ্যানে মরদেহ রাখা হয়। সেখানে স্থানীয় একটি মসজিদের মুয়াজ্জিনসহ পাঁচজন মেঝেতে কাপড় পেতে বসে কোরআন তেলাওয়াত করেন। পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা শেষবারের মতো তাকে দেখার সুযোগ পান। পুরো এলাকায় তখন ছিল শোকাবহ পরিবেশ।
দীপু মনির এক আত্মীয় জানান, স্বামীর মৃত্যুর ঘটনায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। খাওয়াদাওয়ার প্রতিও তার তেমন আগ্রহ নেই। স্বজনেরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। চাঁদপুরের আওয়ামী লীগের নেত্রী জাকিয়া সুলতানা শেফালীও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে দীপু মনির সঙ্গে দেখা করেন।
জাকিয়া সুলতানা শেফালী বলেন, দীপু মনি ভালো নেই। স্বজন হারানোর এমন পরিস্থিতিতে তার মানসিক অবস্থার বিষয়টি সহজেই বোঝা যায়।
এদিকে দীপু মনির কলাবাগানের বাসাকে ঘিরে সকাল থেকেই নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। পুলিশ সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। বাড়িতে যাতায়াতকারী ব্যক্তিদের পরিচয় ও সেখানে আসার কারণ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। আশপাশের এলাকাতেও নজরদারি বাড়ানো হয়, যাতে প্যারোলে মুক্তির সময় নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ধরনের জটিলতা তৈরি না হয়।
পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দুপুরে তৌফীক নাওয়াজের মরদেহ কলাবাগান থেকে গুলশানের আজাদ মসজিদে নেওয়া হয়। সেখানে বাদ জোহর তার জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। জানাজা শেষে মরদেহ বনানী কবরস্থানে দাফনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
কলাবাগান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ফজলে আশিক জানান, জানাজার সময় দীপু মনি প্রিজন ভ্যানেই থাকবেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্ভব হলে তাকে দাফনের সময় কবরস্থানেও উপস্থিত থাকার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। তবে প্যারোলের সময় শেষ হয়ে গেলে তাকে আবার কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত তার প্যারোলে মুক্তির অনুমতি রয়েছে।
তৌফীক নাওয়াজ ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং দীপু মনির স্বামী। মঙ্গলবার রাতে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি কিডনি ও লিভারের বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিলেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর দায়ের হওয়া বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে দীপু মনি বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ কারাগারে আটক রয়েছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর শেষ বিদায়ে অংশ নেওয়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় তাকে সাময়িকভাবে কারাগারের বাইরে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়।
কারাগার থেকে বের হওয়ার পরও তার চলাচল ছিল কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে। কলাবাগানের বাসা থেকে গুলশানের আজাদ মসজিদ পর্যন্ত তাকে প্রিজন ভ্যানে নেওয়া হয়। অন্যদিকে তার স্বামীর মরদেহ ফ্রিজার ভ্যানে করে একই গন্তব্যে নেওয়া হয়। স্বামীর মরদেহ সামনে এবং পেছনে নিরাপত্তারক্ষীদের উপস্থিতিতে এই যাত্রায় শোকের আবহ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তৌফীক নাওয়াজের জানাজা ও দাফনের মধ্য দিয়ে পরিবারের দীর্ঘদিনের একসঙ্গে পথচলার শেষ আনুষ্ঠানিক অধ্যায় সম্পন্ন হওয়ার কথা। আর সেই শেষ বিদায়ে উপস্থিত থাকার জন্য কয়েক ঘণ্টার জন্য কারাগারের বাইরে থাকার সুযোগ পেলেন দীপু মনি। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর তাকে আবার মুন্সীগঞ্জ কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা রয়েছে।









