নরসিংদীর মাধবদীতে পারিবারিক বিরোধের জেরে স্ত্রীকে হত্যার পর মরদেহ গোপনে মাটিচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে শরীফ মিয়া (৪২) নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তাকে আটক করেছে পুলিশ। নিহত হোসনে আরা বেগমের (৩৯) মরদেহ উদ্ধারের জন্য পাশের একটি কবরস্থান থেকে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে উত্তোলনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, নিহতের মরদেহ উদ্ধারের সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত থাকবেন। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হবে। ময়নাতদন্ত ও অন্যান্য তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার বিস্তারিত ক্রম নির্ধারণের চেষ্টা করা হবে।
বুধবার (১৯ আগস্ট) রাতে মাধবদী থানার পুলিশ কাঠালিয়া ইউনিয়নের নোয়াকান্দা গ্রামে নিহতের বাবার বাড়ি থেকে শরীফ মিয়াকে আটক করে। হোসনে আরা ওই গ্রামের রহমান মিয়ার মেয়ে। আর শরীফ মাধবদীর ভগিরথপুর গ্রামের তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে। তিনি মাধবদী গরুর হাট বাজার এলাকায় একটি চায়ের দোকানে কাজ করতেন।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, গত ১৭ আগস্ট রাত আনুমানিক ৮টার দিকে পারিবারিক বিষয় নিয়ে শরীফ ও হোসনে আরার মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে শরীফ স্ত্রীকে থাপ্পড় দেন বলে পুলিশের কাছে দেওয়া বক্তব্যে দাবি করেছেন। এতে হোসনে আরা একটি টিউবওয়েলের ওপর পড়ে অচেতন হয়ে যান বলে তার বক্তব্য। এরপর তিনি আর জ্ঞান ফিরে পাননি বলে পুলিশ জানিয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, স্ত্রী অচেতন হয়ে পড়ার পর তাকে চিকিৎসার জন্য কোথাও না নিয়ে শরীফ ঘরের মেঝেতে মরদেহটি লুকিয়ে রাখেন। পরদিন ১৮ আগস্ট রাত ১০টার পর তিনি একাই মরদেহটি কাঁধে করে বাড়ির পাশের একটি কবরস্থানে নিয়ে যান। সেখানে মাটিচাপা দেওয়ার পর বাড়িতে ফিরে তিনি স্ত্রী রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন বলে আশপাশের লোকজনকে জানান।
ঘটনার পরদিন ১৯ আগস্ট দুপুরে শরীফ তার শ্বশুরকে সঙ্গে নিয়ে মাধবদী থানায় যান। সেখানে স্ত্রী নিখোঁজ হয়েছেন জানিয়ে সাধারণ ডায়েরি করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তবে তার বক্তব্য, কথাবার্তা এবং আচরণে পুলিশের কাছে কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়ে। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় পুলিশ তাকে সাধারণ ডায়েরি করার পরিবর্তে লিখিত অভিযোগ দিতে বলে। অভিযোগ দেওয়ার পর শরীফ শ্বশুরবাড়িতে ফিরে যান।
এরপর পুলিশ বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখতে শুরু করে। শরীফকে নজরদারির মধ্যে রাখা হয়। একই রাতে নোয়াকান্দা গ্রামের শ্বশুরবাড়ি থেকে তাকে আটক করে থানায় নেওয়া হয়। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি স্ত্রীকে হত্যার ঘটনা এবং মরদেহ কোথায় মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তথ্য দেন বলে পুলিশের দাবি।
মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. কামাল হোসেন জানান, স্ত্রী নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর শরীফ থানায় এসে সাধারণ ডায়েরি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার আচরণ ও কথাবার্তায় অসঙ্গতি থাকায় পুলিশ বিষয়টি সন্দেহের চোখে দেখে। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি স্ত্রী হত্যার কথা স্বীকার করেন এবং মরদেহ গোপন করার স্থান সম্পর্কে পুলিশকে জানান।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে মরদেহ উদ্ধার করে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করা। মরদেহ উত্তোলনের পর ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের আলামত এবং অভিযুক্তের বক্তব্য মিলিয়ে দেখা হবে। একই সঙ্গে ঘটনার সময় ঠিক কী ঘটেছিল, স্ত্রীকে চিকিৎসা না দেওয়ার কারণ কী ছিল এবং মরদেহ গোপন করার পেছনে তার উদ্দেশ্য কী—এসব বিষয়ও তদন্তে গুরুত্ব পাবে।
স্ত্রী নিখোঁজ হওয়ার পর থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে যাওয়ার ঘটনাটিও পুলিশের তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ, পুলিশের সন্দেহের সূত্রপাত হয়েছিল মূলত তার বক্তব্য ও আচরণের অসঙ্গতি থেকে। পরে জিজ্ঞাসাবাদে মরদেহের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে পুলিশ।
ঘটনাটি এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়ভাবে পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে এমন মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তবে হত্যার অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে মরদেহের ময়নাতদন্ত, উদ্ধার হওয়া আলামত এবং তদন্তের অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হবে। এ ঘটনায় শরীফের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।









