খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ই ডিসেম্বর ২০২০, ১২:২৮ পিএম
সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী (৮ মে ১৯৩৫ – ১১ সেপ্টেম্বর ২০২২) ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ, সমাজসেবী, নারী নেতৃত্বের পথিকৃৎ এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, জাতীয় সংসদের উপনেতা এবং সাবেক পরিবেশ ও বনমন্ত্রী। সারা জীবন তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, নারীর অধিকার ও সমাজকল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।
Table of Contents
সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৫ সালের ৮ মে, মাগুরা জেলার সাতক্ষীরা গ্রামে তাঁর মামার বাড়িতে। তাঁর পিতা সৈয়দ শাহ হামিদ উল্লাহ এবং মাতা সৈয়দা আছিয়া খাতুন। তিনি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, যেখানে রাজনীতি, সমাজসেবা ও শিক্ষা ছিল পারিবারিক ঐতিহ্য। তাঁর দাদী সৈয়দা হামিদুন্নেসা ছিলেন বামনা উপজেলার প্রভাবশালী সৈয়দ পরিবারের মীর সরওয়ার জানের কন্যা।
সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তী সময়ে গ্রামীণ উন্নয়ন ও শিক্ষা ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৭৪ সালে ইউনেস্কো ফেলোশিপ লাভ করেন।
সেই বছর তিনি বাংলাদেশ গার্ল গাইড অ্যাসোসিয়েশনের জাতীয় কমিশনার হিসেবেও সিলভার এলিফ্যান্ট পদক অর্জন করেন, যা গার্ল গাইডসের সর্বোচ্চ সম্মান।
২০০০ সালে, আমেরিকান বায়োগ্রাফিক্যাল ইনস্টিটিউট তাঁকে ‘বর্ষসেরা নারী’ নির্বাচিত করে আন্তর্জাতিক সম্মাননা প্রদান করে।
২০১০ সালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন।
তাঁর স্বামী ছিলেন রাজনীতিক ও সমাজসেবক গোলাম আকবর চৌধুরী, যিনি ২০১৫ সালের ২৩ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।
এই দম্পতির রয়েছে তিন পুত্র ও এক কন্যা। তাঁর পরিবার রাজনৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধে প্রতিশ্রুতিশীল।
সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ শুরু হয় ১৯৫৬ সাল থেকে।
১৯৬৯–৭৫ সময়কালে তিনি বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন।
সে সময় তিনি ভারতের কলকাতার গোবরা নার্সিং ক্যাম্পের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা ছিল নারী মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের অন্যতম কেন্দ্র।
১৯৭২–৭৫ সালে তিনি ছিলেন বাংলাদেশ নারী পুনর্বাসন বোর্ডের পরিচালক।
একই সময় তিনি বাংলাদেশ গার্ল গাইড অ্যাসোসিয়েশনের জাতীয় কমিশনার হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে টেকনোক্র্যাট কোটায় পরিবেশ ও বনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান।
২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর–২ (নগরকান্দা, সালথা ও কৃষ্ণপুর ইউনিয়ন) আসন থেকে নির্বাচিত হন এবং ২০০৯ সালে সংসদের উপনেতা নিযুক্ত হন।
তিনি পরপর তিনবার (২০১৪ ও ২০১৮ সালেও) নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদের উপনেতা পদ অলংকৃত করেন, যা তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও দলের প্রতি আনুগত্যের প্রতীক।
তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা দেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।
২০০৮ সালের ১০ জুলাই, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে ১৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এনে মামলা করে।
তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং ২০০৮ সালের ১৮ নভেম্বর হাইকোর্ট মামলাটি স্থগিত করেন।
পরবর্তীতে ২০১০ সালের ২৯ নভেম্বর, হাইকোর্ট মামলাটি অব্যাহতিপ্রাপ্ত হিসেবে খারিজ করে দেন, কারণ অভিযোগ সুসংগঠিত ও বিশ্বাসযোগ্য ছিল না বলে আদালতের মত ছিল।
২০২২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর, বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি হন। দীর্ঘ চিকিৎসার পর, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখে রাত ১১টা ৪০ মিনিটে, তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশ হারায় এক অভিজ্ঞ ও আদর্শবান নেত্রীকে, যিনি জীবনভর গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং নারী ক্ষমতায়নে অবিচল ছিলেন।

সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক দুর্দান্ত সংগ্রামী নারীর প্রতীক। একদিকে তিনি ছিলেন দলীয় দায়িত্বে দৃঢ়, অন্যদিকে সমাজসেবায় নিবেদিত। মুক্তিযুদ্ধকালীন পরিচালনা, সংসদীয় নেতৃত্ব, এবং দলীয় সংগঠনে তাঁর ভূমিকা—তিনিই ছিলেন নারীর রাজনৈতিক অগ্রগতির আলোকবর্তিকা। আজকের প্রজন্ম তাঁর জীবন থেকে শিখতে পারে নেতৃত্ব, সেবাভাবনা, দৃঢ়তা ও সততার পাঠ।
মন্তব্য