খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই জুলাই ২০২৬, ৪:৭ পিএম

চ্যানেল আই সেরাকণ্ঠ প্রতিযোগিতার মঞ্চে সুরের জাদু ছড়িয়ে একসময় দেশজুড়ে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন মির্জা তানজিম শরীফ মুগ্ধ। কণ্ঠের অনবদ্য মাধুর্য দিয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করা সেই পরিচিত মুখ এবার সম্পূর্ণ নতুন ও এক অনন্য পরিচয়ে পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছেন। ৪৭তম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) পরীক্ষার সদ্য প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলাফলে প্রশাসন ক্যাডারে সাধারণ মেধার ভিত্তিতে সরকারি চাকরির জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। দেশজুড়ে তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ এই পরীক্ষার জাতীয় মেধাতালিকায় প্রথম ৫০ জনের মধ্যে নিজের নাম লিখিয়ে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পদে যোগদানের চূড়ান্ত সবুজ সংকেত পেয়েছেন এই প্রতিভাবান তরুণ।
গত মঙ্গলবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক আবেগঘন পোস্টের মাধ্যমে নিজের জীবনের এই গৌরবময় অর্জনের কথা ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীদের জানান মুগ্ধ। তিনি লেখেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। ৪৭তম বিসিএস। প্রশাসন ক্যাডার। মেধাক্রমে দেশের প্রথম ৫০-এ স্থান করে নিয়ে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পদে সুপারিশপ্রাপ্তির সুসংবাদ জানাই সবাইকে।’
পোস্টে নিজের কঠিন ও নিরলস পথচলার স্মৃতিচারণ করে ২০১৯ সাল থেকে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত মুগ্ধ আরও যোগ করেন, ‘শত দায়িত্বের চাপ, সহস্র সংশয়, দোটানা। তারপরও অজস্র প্রশ্নোত্তরের খোঁজে ৪৭, সমুদ্র পাড়ি দেওয়া বান্দার শ্রমের প্রতিদান যিনি দিয়েছেন, সেই মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে লাখোকোটি শুকরিয়া।’ শিক্ষকতা পেশার প্রতি পরম শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি উল্লেখ করেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিচয় তাঁকে যে পেশাদারী আত্মতৃপ্তি দিয়েছে, বিসিএসের এই পর্বতসম সাফল্যের আনন্দের মধ্যেও সেই অনুভূতির মূল্য তাঁর কাছে অপরিবর্তিত রয়েছে।
মির্জা তানজিম শরীফ মুগ্ধর মেধার দ্যুতি ছড়ানোর গল্পটি অবশ্য নতুন কিছু নয়। বিদ্যালয় জীবন থেকেই তিনি ছিলেন প্রখর মেধার অধিকারী। প্রাথমিক ও জুনিয়র স্তরে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করেন তিনি। পরবর্তীতে ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ ময়মনসিংহের জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকার স্বনামধন্য নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর দেশের সর্বোচ্চ প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে কৃতিত্বের সাথে প্রকৌশল ডিগ্রি অর্জন করেন।
কেবল প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনাই নয়, গণিতের জটিল মারপ্যাঁচেও মুগ্ধ ছিলেন সমান পারদর্শী। ২০১২ সালে আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত ৫৩তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে (IMO) দেশের লাল-সবুজ পতাকা রিপ্রেজেন্ট করে ‘অনারেবল মেনশন’ সম্মাননা অর্জন করেন তিনি। এছাড়া জাতীয় গণিত অলিম্পিয়াডের মঞ্চে রেকর্ড ছয়বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনন্য কীর্তি রয়েছে তাঁর ঝুলিতে।
২০১০ সালে চ্যানেল আই সেরাকণ্ঠের মুকুট জয় করে দেশব্যাপী পরিচিতি পেলেও মুগ্ধর বিচরণ ছিল বহুমাত্রিক ক্ষেত্রে। সংগীতের পাশাপাশি উপস্থিত বক্তৃতা, সৃজনশীল রচনা লিখন, চিত্রাঙ্কন, বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড ও পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াডসহ বিভিন্ন জাতীয় প্রতিযোগিতায় অবলীলায় পুরস্কার জিতেছেন তিনি। বুয়েটে পা রাখার আগেই তাঁর ব্যক্তিগত অর্জনের খাতায় জমা হয়েছিল ২৯টি জাতীয় পর্যায়ের পুরস্কার। পড়াশোনা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ক্রীড়াঙ্গনেও তিনি ছিলেন সফল; ২০০৮ সালে আন্তঃস্কুল বাস্কেটবল ও টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি।
ময়মনসিংহের চড়পাড়ার এক সমাদৃত পরিবারে জন্ম নেওয়া মুগ্ধর পিতা ইসকান্দর মির্জা পেশায় একজন কলেজশিক্ষক এবং মাতা তাহমিনা বেগম একজন স্বাস্থ্য পরিদর্শক। তিন ভাইয়ের মধ্যে মুগ্ধ দ্বিতীয় এবং ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর একটি যমজ ভাই রয়েছে। সুরের ভুবন, গণিতের মঞ্চ কিংবা বুয়েটের আঙিনা—সবখানেই নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখা মির্জা তানজিম শরীফ মুগ্ধ এবার পা রাখছেন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী ও মাঠ প্রশাসনের আঙিনায়। আমলাতন্ত্রের এই নতুন অধ্যায়ে সততা, নিষ্ঠা এবং জনকল্যাণের ব্রত নিয়ে দেশসেবার এক নতুন অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন এই নবীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।
মন্তব্য