খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই জুলাই ২০২৬, ১২:৪৯ এএম

ফুটবল মাঠে তিনি সম্ভাব্য সবকিছুই জিতেছেন, বহুবার খাদের কিনারা থেকে দলকে উদ্ধার করে ভাসিয়েছেন আনন্দের জোয়ারে। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর মঞ্চে যে নাটকীয়তার জন্ম হলো, তা হয়তো লিওনেল মেসির নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারেও বিরল। ম্যাচ জুড়ে কখনো দুই গোলে পিছিয়ে থাকার শঙ্কা, কখনো পেনাল্টি মিসের তীব্র হতাশা—এক সময় তো টুর্নামেন্ট থেকে চ্যাম্পিয়নদের বিদায় নেওয়ার বাস্তব চিত্রটাই চোখের সামনে ভাসছিল। অথচ ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর দেখা গেল এক সম্পূর্ণ অন্যরকম দৃশ্য। দুই হাতের মুঠো শক্ত করে মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। আবেগ আর স্বস্তির সেই জল লুকানোর কোনো চেষ্টাই যেন ছিল না তাঁর চোখে।
মিশরকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেছে আলবিসেলেস্তেরা। ম্যাচের ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা একটি দল কীভাবে শেষ ১১ মিনিটে তিন-তিনটি গোল করে ম্যাচের ভাগ্য পুরোপুরি বদলে দিতে পারে, আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে তা এক নতুন রূপকথা। এই ঐতিহাসিক ও অবিশ্বাস্য জয়ের পর আর নিজের ভেতরের অবদমিত আবেগকে ধরে রাখতে পারেননি দলের প্রাণভ্রমরা লিওনেল মেসি।
আসলে পুরো ম্যাচজুড়েই মেসির জন্য দিনটা একদম সহজ ছিল না। প্রথমার্ধে পেনাল্টি থেকে গোল করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও তিনি তা জালে জড়াতে ব্যর্থ হন। এরপর তাঁর নেওয়া একটি নিখুঁত ফ্রি-কিক পোস্টে লেগে ফিরে আসলে হতাশা আরও ঘনীভূত হয়। ওদিকে মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইরও সেদিন যেন চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন; একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে তিনি আর্জেন্টিনাকে গোলবঞ্চিত রাখছিলেন। কিন্তু দল যখন ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে বিদায়ের প্রহর গুনছিল, ঠিক তখনই খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন মেসি। তাঁর এক জাদুকরি পাস থেকে প্রথমে ক্রিস্তিয়ান রোমেরো গোল করে ব্যবধান কমান। এর ঠিক পরেই ডিফেন্ডারদের বোকা বানিয়ে মেসি নিজেই করেন সমতাসূচক দ্বিতীয় গোলটি। আর ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে এনসো ফের্নান্দেসের নেওয়া শট যখন মিশরের জাল কাঁপিয়ে দেয়, তখন পূর্ণতা পায় আর্জেন্টিনার এই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন। বিশ্বকাপের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এর আগে কখনো দুই গোলে পিছিয়ে পড়ে ম্যাচ জিততে পারেনি আর্জেন্টিনা।
ম্যাচ শেষের রেফারি যখন শেষ বাঁশি বাজালেন, তখনই যেন মেসিময় এই রাতের সমস্ত আবেগের বাঁধ ভেঙে যায়। দুই হাত মুঠো করে প্রথমে আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করেন এবং পরক্ষণেই মাঠের ভেতর হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন। তাঁর চোখ বেয়ে তখন নামছিল আনন্দের জল। মুহূর্তের মধ্যেই দলের বাকি তরুণ সতীর্থরা ছুটে এসে তাদের প্রিয় অধিনায়ককে জড়িয়ে ধরেন। জয়ের এই বাঁধভাঙা উল্লাসে তখন পুরো আর্জেন্টিনা শিবিরের অনেকের চোখেই ছিল আনন্দাশ্রু।
বিশ্ব ফুটবলে মেসির অর্জনের তালিকা অনেক দীর্ঘ, ট্রফি ক্যাবিনেটে অপূর্ণতা বলতে কিছু নেই। তবে খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর এমন রোমাঞ্চকর রাত, যেখানে নিজে পেনাল্টি মিসের যন্ত্রণা সয়েছেন আবার দলকে টেনেও তুলেছেন—এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি তিনি ক্যারিয়ারে খুব কমই হয়েছেন। আর তাই শেষ বাঁশির পরের ওই কান্নাই বলে দিচ্ছিল, ৩৯ বছর বয়সে এসেও এই বিশ্বজয়ের ক্ষুধা এবং আর্জেন্টিনার জার্সির প্রতি তাঁর টান কতটা তীব্র।
মন্তব্য