মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পাল্টা হামলার পর বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত লাফিয়ে বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে অন্যতম বড় উত্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রোববার (৮ মার্চ) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একপর্যায়ে প্রায় ২০ শতাংশের বেশি বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৪ ডলারে পৌঁছায়। পরদিন সোমবার সকালে তা আরও বেড়ে ১১৯.৫০ ডলার পর্যন্ত উঠে যায়। যদিও পরে কিছুটা কমে বর্তমানে প্রায় ১১২.৯৮ ডলারে লেনদেন হচ্ছে। ২০২২ সালে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর সময়ের পর এই প্রথম আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও ১০০ ডলারের ওপরে উঠল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু হলো হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগরের এই সংকীর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে যদি সামান্য সময়ের জন্যও সরবরাহ ব্যাহত হয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই আশঙ্কার কারণেই সাম্প্রতিক দিনগুলোতে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কম ঘনত্বের এনওয়াইমেক্স ক্রুডের দামও দ্রুত বেড়েছে। এশীয় লেনদেনে ব্রেন্ট ও এনওয়াইমেক্স উভয় ধরনের তেলের দাম প্রায় সমান পর্যায়ে পৌঁছায়, যা বাজারে অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয়।
নিচে সাম্প্রতিক সময়ের আন্তর্জাতিক তেলের দামের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র দেওয়া হলো—
| তেলের ধরন | সর্বোচ্চ দাম (ডলার/ব্যারেল) | বর্তমান আনুমানিক দাম | বৃদ্ধি |
|---|---|---|---|
| ব্রেন্ট ক্রুড | ১১৯.৫০ | ১১২.৯৮ | প্রায় ২০%+ |
| এনওয়াইমেক্স ক্রুড | ১১৪.৭৮ | প্রায় ১১০+ | প্রায় ২৬% |
জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে দাম দ্রুত বাড়তে পারে। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক ট্রেডিং ডটকমের প্রধান নির্বাহী পিটার ম্যাকগুইরের মতে, যদি উপসাগরীয় অঞ্চলের আরও কয়েকটি দেশ উৎপাদন বা রপ্তানি সীমিত করে, তাহলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৪০ থেকে ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মহলেও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জি–৭ ভুক্ত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীরা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মাধ্যমে কৌশলগত মজুত তেল বাজারে ছাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছেন। এর লক্ষ্য হলো বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যবৃদ্ধির চাপ কিছুটা কমানো।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বিষয়ে তেমন উদ্বেগ প্রকাশ করেননি। তার মতে, স্বল্প সময়ের জন্য তেলের দাম বৃদ্ধি বিশ্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তুলনায় তেমন বড় বিষয় নয়। তিনি বলেন, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে গেলে জ্বালানি বাজার দ্রুত স্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
একই সুরে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইটও মন্তব্য করেছেন যে, পেট্রোলের দাম সাময়িকভাবে বাড়লেও তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এরই মধ্যে ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড কর্পস সতর্ক করে বলেছে, সংঘাত চলতে থাকলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছানোর ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।









