লেবাননের রাজধানী বৈরুতে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ঘাঁটিতে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি চরম উত্তেজনাকর রূপ ধারণ করেছে। এর প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া হিসেবে আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইসরায়েলের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ইরান সরাসরি ব্যালিস্টিক বা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারে—এমন সুনির্দিষ্ট আশঙ্কায় ইসরায়েলজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইসরায়েলি প্রশাসন দেশের অভ্যন্তরে নাগরিকদের চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে এবং তাদের সামরিক বাহিনীকে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছে।
ইসরায়েরি প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রস্তুতি ও জরুরি মূল্যায়ন
ইসরায়েলের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম ‘টাইমস অব ইসরায়েল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে ধারণা করছে যে, ইরান তাদের সামরিক ঘাঁটি থেকে সরাসরি ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে। সম্ভাব্য এই আক্রমণাত্মক তৎপরতার প্রেক্ষিতে আইডিএফ প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির তাঁর শীর্ষস্থানীয় সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠক করেছেন। এই বৈঠকে সামগ্রিক পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য ঝুঁকির মাত্রা মূল্যায়ন করে প্রতিরক্ষামূলক কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে।
আইডিএফের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি জারি করে জানানো হয়েছে যে, তারা প্রতিরক্ষামূলক ঢাল তৈরি এবং একই সঙ্গে পাল্টা আক্রমণ পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ স্তরের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে দেশের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে যেকোনো ধরনের বিদেশি আগ্রাসন বা হামলা চালানো হলে তা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না এবং এর কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
হোম ফ্রন্ট কমান্ডের কঠোর বিধিনিষেধ ও জনসমাগম সীমিতকরণ
ইরানের সম্ভাব্য হামলার সময় ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখার উদ্দেশ্যে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা তদারকি সংস্থা ‘হোম ফ্রন্ট কমান্ড’ দেশজুড়ে সর্বসাধারণের চলাফেরা এবং জনসমাগমের ওপর সাময়িক বিধিনিষেধ ও নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। নতুন নিরাপত্তা প্রোটোকল অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরে যেকোনো ধরনের বড় বড় জমায়েত বা অনুষ্ঠানে পাঁচ হাজার জনের বেশি মানুষ একসঙ্গে অংশ নিতে পারবে না।
উত্তেজনাপ্রবণ ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে এই বিধিনিষেধের মাত্রা আরও অনেক বেশি কঠোর করা হয়েছে। নতুন আদেশ অনুযায়ী, সীমান্তবর্তী এলাকায় খোলা আকাশের নিচে বা বাইরে সর্বোচ্চ ১০০ জন এবং চার দেয়ালের ভেতরে বা ঘরোয়া স্থানে ৪০০ জনের বেশি মানুষের জমায়েত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে উদ্ভূত এই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মধ্যেও এখন পর্যন্ত দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা স্কুলগুলো স্বাভাবিকভাবে চালু রাখার সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে ইসরায়েলি প্রশাসন।
বৈরুতে ইসরায়েলি হামলা ও মার্কিন প্রতিক্রিয়া
এই নতুন উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটে রোববার লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর একটি ভয়াবহ বিমান হামলার মাধ্যমে। এই হামলায় হিজবুল্লাহর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন মানুষ নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। উল্লেখ্য, এর আগেও বৈরুতে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের জবাবে ইরান সরাসরি ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল।
এদিকে এই সাম্প্রতিক বিমান হামলার পর বৈশ্বিক রাজনীতিতেও এর প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে চালানো ইসরায়েলি বিমান হামলার তীব্র সমালোচনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেন, ইসরায়েলের অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী আত্মরক্ষার পূর্ণ অধিকার রয়েছে, তবে বর্তমানের এই আক্রমণাত্মক পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে আরও ইঙ্গিত দেন যে, মার্কিন প্রশাসনের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক সমঝোতা চুক্তি নিয়ে আলোচনার সময়ে এই ধরনের সামরিক হামলা অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো চূড়ান্ত দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক সমঝোতা চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে কি না, তা এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়নি।
