ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়াম স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের লাল ও সাদা পতাকার রঙে সেজেছিল। উত্তর আমেরিকার এই দেশটি বিশ্বকাপের অন্যতম প্রধান আয়োজক হিসেবে নিজেদের মাঠে হাজার হাজার ফুটবল ভক্তকে বিন্দুমাত্র নিরাশ করেনি। মাঠের লড়াইয়ে এক প্রভাবশালী পারফরম্যান্স প্রদর্শন করে তারা লাতিন আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়েকে ৪-১ ব্যবধানে পরাজিত করেছে। এই দাপুটে জয়ের মধ্য দিয়েই স্বাগতিক দল বৈশ্বিক এই মহোৎসবে নিজেদের যাত্রা শুরু করল।
বিগত ১৯৯৪ সালের পর এই প্রথম পুরুষ ফুটবল বিশ্বকাপ আবার যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে প্রত্যাবর্তন করেছে। ফলে এবার নিজেদের পরিচিত কন্ডিশনে বেশ বড় লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে মার্কিন দলটি। দলের পক্ষে ফোলারিন বালোগুনের চমৎকার জোড়া গোল এবং জিওভান্নি রেইনার দৃষ্টিনন্দন এক গোলের উপর ভর করে যুক্তরাষ্ট্র এই বড় ব্যবধানের জয় তুলে নেয়। ম্যাচের অন্য গোলটি এসেছে প্যারাগুয়ের মিডফিল্ডারের আত্মঘাতী ভুলের মাধ্যমে। এর মাধ্যমে ফুটবল ইতিহাসের পাতায় নিজেদের নাম নতুন করে লিখল মার্কিন ফুটবলাররা; কারণ বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচে এবারই প্রথম তারা চার গোল করার অনন্য কৃতিত্ব অর্জন করল।
প্রথমার্ধের আধিপত্য ও দলের মূল পরিসংখ্যান
নিম্নে উক্ত ম্যাচের গোল ও দলগত পারফরম্যান্সের একটি বিবরণী টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| ম্যাচের মূল বিবরণ | যুক্তরাষ্ট্র দলের তথ্য | প্যারাগুয়ে দলের তথ্য |
| চূড়ান্ত গোল সংখ্যা | ৪ | ১ |
| প্রথমার্ধের স্কোরলাইন | ৩-০ | ০-০ |
| প্রথম গোলের সময় | ৭ম মিনিট (আত্মঘাতী) | ৭৩তম মিনিট (স্বাভাবিক) |
| ম্যাচের সেরা গোলদাতা | ফোলারিন বালোগুন (২টি) | প্রাদো মরিসিও (১টি) |
| ব্যবহৃত বদলি খেলোয়াড় | ৩ জন | ৪ জন |
| ম্যাচে সতর্কীকরণ (হলুদ কার্ড) | ১টি | ৫টি |
নতুন কৌশলে বদলে যাওয়া মার্কিন দল
বিগত ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে চার ম্যাচ মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট গোলের সংখ্যা ছিল মাত্র তিনটি। তাছাড়া এই ঐতিহাসিক ম্যাচের পূর্বে তারা বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে কোনো একটি একক ম্যাচে কখনোই তিন গোলের বেশি করতে সমর্থ হয়নি। তবে নতুন প্রধান কোচ মরিসিও পচেত্তিনোর সৃজনশীল ও আক্রমণাত্মক কৌশল যেন দলটিকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেসের ৭০,৪৯২ জন দর্শকসমৃদ্ধ ভেন্যুতে এক ভিন্ন রূপে এবং নতুন উদ্দীপনায় মাঠে ধরা দিয়েছে স্বাগতিক দলটি।
ম্যাচের প্রথমার্ধে দুর্দান্ত পাসিং ও চমৎকার প্লেমেকিং গড়ে একটি সুনিপুণ অ্যাসিস্ট করেন ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ। তবে দ্বিতীয়ার্ধে কৌশলগত কারণে তাকে আর মাঠে নামানো হয়নি। তিনি কোনো গুরুতর চোট পেয়েছেন কি না সেই বিষয়ে অবশ্য নিশ্চিত কোনো তথ্য মেলেনি। তবে খেলা চলাকালীন গ্যালারিতে থাকা নিজের পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশ্য করে তিনি ইশারায় বার্তা দিয়েছেন যে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন। প্রথমার্ধের বিরতির সময় পুলিসিচের পরিবর্তে মাঠে প্রবেশ করেন সেবাস্তিয়ান বারহাল্টার। মার্কিন দলের প্রথম দুটি গোলের পেছনেই পুলিসিচের ক্ষিপ্র গতি আর সৃজনশীলতার অবদান ছিল।
মার্কিনিদের আক্রমণাত্মক ফুটবলের সামনে প্যারাগুয়ে রক্ষণভাগ শুরু থেকেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ফলে প্রথমার্ধেই ৩-০ গোলের বিশাল ব্যবধান তৈরি করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে যেকোনো ম্যাচের প্রথমার্ধে দলটির সবচেয়ে বড় ব্যবধানের জয়ের নতুন রেকর্ড।
বালোগুনের জোড়া গোল ও রেইনার ব্যবধান বৃদ্ধি
খেলার শুরুর মাত্র সাত মিনিটে পুলিসিচের তৈরি করা একটি বিপজ্জনক আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়ে প্যারাগুয়ের মিডফিল্ডারের পায়ে লেগে বল আত্মঘাতী গোল হিসেবে জালে জড়ায়। এর ফলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় স্বাগতিক দেশ। এরপর ম্যাচের ৩১তম মিনিটে নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক বিশ্বকাপ গোল সম্পন্ন করেন ফোলারিন বালোগুন। প্রথমার্ধের নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষে অতিরিক্ত সময়ের পঞ্চম মিনিটে (৪৫+৫ মিনিটে) নিজের এবং দলের পক্ষে আরো একটি গোল করে ব্যবধান ৩-০ করেন তিনি। নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া এবং লন্ডনে বেড়ে ওঠা এই ২৪ বছর বয়সী স্ট্রাইকার বিশ্বকাপে নিজের অভিষেক ম্যাচেই জোড়া গোল করার গৌরব অর্জন করলেন। ১৯৩০ সালের পর বিশ্বকাপে কোনো মার্কিন ফুটবলারের এক ম্যাচে একাধিক গোল করার ঘটনা এটিই প্রথম।
তিন বছর আগে ইংল্যান্ডের জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ পরিত্যাগ করে আন্তর্জাতিক ফুটবলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে বেছে নিয়েছিলেন মোনাকোর এই ফরোয়ার্ড। নিজের অভিষেক ম্যাচেই এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি মার্কিন দলের দীর্ঘদিনের ফরোয়ার্ড সংকটের একটি নির্ভরযোগ্য সমাধানের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে রাখলেন।
পুলিসিচ প্রথমার্ধের পর মাঠ ছাড়ার দরুন দ্বিতীয়ার্ধের খেলায় যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা খেলার ছন্দ হারালেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই ছিল। ম্যাচের ৭৩তম মিনিটে প্যারাগুয়ের প্রাদো মরিসিও একটি গোল করে ব্যবধান কিছুটা কমিয়ে ৩-১ এ নিয়ে আসেন। তবে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে অর্থাৎ দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ের সপ্তম মিনিটে (৯০+৭ মিনিটে) দলের পক্ষে চতুর্থ গোলটি করেন জিওভান্নি রেইনা। প্রতিপক্ষের ডি-বক্সের ভেতরে ঢুকে চমৎকার এক টো-ফ্লিকে তিনি নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ গোলটি সম্পন্ন করেন এবং দলের ৪-১ ব্যবধানের এই বিশাল জয় নিশ্চিত করেন। কাতার বিশ্বকাপে সাবেক কোচের সাথে পারিবারিক বিরোধের কারণে রেইনা খেলার খুব একটা সুযোগ পাননি। ফলে তার জন্য এই গোল এবং ঐতিহাসিক মুহূর্তটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।
