খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জুন ২০২৬, ১০:১৮ পিএম

ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ নিয়ন্ত্রিত অধিকৃত পশ্চিম তীরের ‘এ’ অঞ্চলের অন্তত ১০০টি কৌশলগত স্থান জোরপূর্বক দখলের এক মহাকল্পনা হাতে নিয়েছে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠীগুলো। তেল আবিব থেকে প্রকাশিত হিব্রু দৈনিক ‘ইসরাইল হাইয়োম’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। মূলত অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের দুটি প্রধান সংগঠন ‘সেটলার ফার্মস অ্যাসোসিয়েশন’ এবং ‘হাভাত (ফার্মস) ফোরাম’ যৌথভাবে এই নীল নকশা তৈরি করেছে। এই আগ্রাসী পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ভৌগোলিক মানচিত্রকে পুরোপুরি বদলে দেওয়া।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই খসড়া প্রস্তাবে একটি সুনির্দিষ্ট দিনকে ‘বাস্তবায়নের দিন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেই নির্ধারিত দিনে একযোগে পশ্চিম তীরের প্রায় ১০০টি গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত স্থানে সশস্ত্র বাহিনী ও উগ্র বসতি স্থাপনকারীদের মোতায়েন করার একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। যে স্থানগুলোকে টার্গেট করা হয়েছে, তার সবকটিই পশ্চিম তীরের ‘এ’ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। উল্লেখ্য, ১৯৯৫ সালের ঐতিহাসিক অসলো-২ চুক্তি অনুযায়ী, এই ‘এ’ অঞ্চলের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত যাবতীয় নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের (PA) হাতে থাকার কথা।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমটির দাবি, এই পরিকল্পনাটি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি ইতিমধ্যেই ইসরাইলি সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মহলের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সবচেয়ে আশঙ্কার কথা হলো, এই দখলের তালিকায় ফিলিস্তিনিদের মূল প্রধান শহরগুলোর চারপাশের কৌশলগত খালি জায়গাগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে ফিলিস্তিনিদের অবরুদ্ধ করে ফেলা যায়।
প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) অধিভুক্ত অ্যান্টি-ওয়াল অ্যান্ড সেটেলমেন্ট কমিটির সভাপতি মুয়াইয়াদ শাবান এই প্রস্তাবের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি এই পদক্ষেপটিকে অধিকৃত পশ্চিম তীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলের মানচিত্রের সঙ্গে জুড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তেল আবিবের একটি চরম বিপজ্জনক চাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। শাবান স্পষ্ট করে বলেন, এটি সাধারণ কোনো অবৈধ বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠীর নিজস্ব বা স্বাধীন উদ্যোগ নয়। এর পেছনে সরাসরি উগ্র ডানপন্থি বর্তমান ইসরাইলি সরকারের সুদূরপ্রসারী ও বৃহত্তর আগ্রাসী নীতির সুস্পষ্ট প্রতিফলন রয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলি সেনাবাহিনী প্রায় প্রতিদিনই পশ্চিম তীরের বিভিন্ন শহর ও শরণার্থী শিবিরে নিয়মিত সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। এসব অভিযানে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ঢালাওভাবে গ্রেপ্তার, মাঠপর্যায়ে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ এবং সাধারণ মানুষের ঘরবাড়িতে ভাঙচুর ও তল্লাশি চালানো এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাজা উপত্যকায় চলমান সংঘাতের পাশাপাশি পশ্চিম তীরেও রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতি তৈরি করে রাখা হয়েছে।
ফিলিস্তিনিদের দেওয়া সর্বশেষ পরিসংখ্যান ও সরকারি উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর মাস থেকে শুরু হওয়া সাম্প্রতিক সংঘাতের পর থেকে এ পর্যন্ত কেবল পশ্চিম তীরেই ইসরাইলি সেনাবাহিনী এবং সশস্ত্র উগ্র দখলদারদের হামলায় ১ হাজার ১৭৩ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এই সময়ে ইসরাইলি বাহিনীর বুলেটে ও অত্যাচারে আহত হয়েছেন ১২ হাজার ৬৬৬ জনেরও বেশি মানুষ। এছাড়া রাজনৈতিক ও প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডের অপরাধে প্রায় ২৩ হাজার ফিলিস্তিনিকে বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার করে ইসরাইলের সামরিক কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহল এই বসতি স্থাপনের নতুন পরিকল্পনাকে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আরেকটি ধাপ হিসেবে দেখছে।
মন্তব্য