লেখক: জামিল আক্তার
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ইতিহাস আসলে শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্যাসক্ষেত্র কিংবা পাইপলাইন নির্মাণের ইতিহাস নয়। এটি একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা, জাতীয় সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়নের জন্য নিজস্ব জ্বালানি সক্ষমতা গড়ে তোলার রাজনৈতিক দর্শনের ইতিহাস।
এই ইতিহাসের শুরুটা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ যখন অর্থনৈতিকভাবে প্রায় শূন্য থেকে যাত্রা শুরু করেছে, তখনও বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন অনেকাংশে নির্ভর করবে জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর।
১৯৭৫ সালের ৯ আগস্ট সেই দূরদর্শী চিন্তার সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর একটি আমরা দেখতে পাই। বহুজাতিক শেল অয়েল কোম্পানির কাছ থেকে মাত্র ৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন পাউন্ড স্টার্লিং দিয়ে তিতাস, বাখরাবাদ, হবিগঞ্জ, রশিদপুর ও কৈলাশটিলা এই পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র কিনে নেয় বাংলাদেশ। এর মাধ্যমে দেশের গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসসম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়।
সদ্য স্বাধীন, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের জন্য এটি ছিল অত্যন্ত সাহসী সিদ্ধান্ত। তখন দেশের রিজার্ভে অর্থ ছিল না, অবকাঠামো ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত, শিল্পকারখানা বিপর্যস্ত। চারদিকে ছিল সংকট। এর মধ্যেও বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন, সাময়িক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি।
শুধু গ্যাসক্ষেত্র কিনেই বঙ্গবন্ধুর জ্বালানি ভাবনা থেমে থাকেনি। ১৯৭২ সালে পেট্রোবাংলা প্রতিষ্ঠা, দেশের খনিজ সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালনের কাঠামো গড়ে তোলা, ১৯৭৪ সালে পেট্রোলিয়াম ও সমুদ্র আইন প্রণয়নসহ একের পর এক পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে তিনি একটি স্বনির্ভর জ্বালানি কাঠামোর ভিত্তি তৈরি করেছিলেন।
অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর কাছে জ্বালানি ছিল শুধু একটি পণ্য নয়। জ্বালানি ছিল রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অন্যতম ভিত্তি।
দুর্ভাগ্য হলো, এই পরিকল্পনাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু সময় পেয়েছিলেন মাত্র সাড়ে তিন বছর। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাঁকে হত্যার মধ্য দিয়ে শুধু একজন রাষ্ট্রনায়কের জীবনই থেমে যায়নি, থেমে যায় একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উন্নয়ন দর্শনের ধারাবাহিকতাও।
পরবর্তী দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশের জ্বালানি খাত নানা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, অব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ ঘাটতির মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সময়কালে গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নানা সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। দেশের এক অঞ্চলে গ্যাস থাকলেও প্রয়োজনীয় সঞ্চালন অবকাঠামোর অভাবে তা অন্য অঞ্চলে পৌঁছানো যাচ্ছিল না। এর প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা ও শিল্প খাতে। দেশজুড়ে লোডশেডিংও তখন নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে ওঠে।
১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে নতুন করে পরিকল্পিত উদ্যোগ শুরু হয়। এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, সরকার জ্বালানি ও বিদ্যুৎকে আলাদা দুটি খাত হিসেবে না দেখে পরস্পর সম্পর্কিত জাতীয় অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করেছিল।
আশুগঞ্জ-বাখরাবাদ গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণের মাধ্যমে পূর্বাঞ্চলের গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ বাড়ে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সার কারখানাগুলোর কার্যক্রমও স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
একই সময়ে বঙ্গবন্ধু যমুনা বহুমুখী সেতু বরাবর পাইপলাইন নির্মাণসহ দেশের পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাস সঞ্চালনের অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সালদা, মেঘনা, বিয়ানীবাজার, সাঙ্গু ও জালালাবাদসহ বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। মৌলভীবাজারসহ নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের পথও তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে বিবিয়ানা বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে আবির্ভূত হয়।
বিদ্যুৎ খাতেও এই সময় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়। মেঘনাঘাট ও হরিপুরে বড় আইপিপি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। বার্জ-মাউন্টেড বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল একটি বিষয়। শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র বানালেই বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য গ্যাস বা অন্য জ্বালানি দরকার। সেই জ্বালানি আনতে পাইপলাইন দরকার। গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করতে অনুসন্ধান দরকার। অনুসন্ধানের জন্য রিগ দরকার। আর পুরো ব্যবস্থাকে কার্যকর রাখতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ।
১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের উদ্যোগগুলো তাই বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক তৈরি করেছিল।
কিন্তু ২০০১ সালের পর সেই ধারাবাহিকতা আর একইভাবে এগোয়নি। নতুন অনুসন্ধান, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি তৈরি হয়। এর ফল কয়েক বছর পর দেশকে আবারও ভোগ করতে হয়। ২০০৬-০৭ সালের দিকে এসে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে শিল্প, ব্যবসা এবং সাধারণ মানুষের জীবন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২০০৯ সালে শেখ হাসিনা সরকার আবার দায়িত্ব নেওয়ার সময় তাই জ্বালানি খাতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সক্ষমতা পুনর্গঠন।
তখন দেশের গ্যাস উৎপাদন ছিল প্রায় ১ হাজার ৭৪৪ এমএমসিএফডি। অনুসন্ধান কার্যক্রমও দীর্ঘদিনের ঘাটতিতে ছিল। কূপ খননের জন্য সচল রিগের সংকট ছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি হয়ে পড়েছিল।
শেখ হাসিনা সরকার তখন কয়েকটি বিষয়কে একই সঙ্গে সামনে রেখে কাজ শুরু করে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন, পুরনো কূপে ওয়ার্কওভার, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার, গ্যাস সঞ্চালন অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং প্রয়োজনে আমদানি করা গ্যাসের ব্যবস্থা।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত ১৫৫টি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই সময়ে সুন্দলপুর, শ্রীকাইল, রূপগঞ্জ, ভোলা নর্থ, জাকিগঞ্জ ও ইলিশাসহ নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। দেশীয় গ্যাস উৎপাদনও এক পর্যায়ে প্রায় ২ হাজার ৭৫০ এমএমসিএফডিতে উন্নীত হয়।
শুধু কূপ খনন নয়, অনুসন্ধানের সক্ষমতাও বাড়ানো হয়। পুরনো রিগ পুনরায় সচল করার পাশাপাশি নতুন রিগ সংগ্রহ করা হয়। ২ডি ও ৩ডি সিসমিক জরিপ পরিচালনা করা হয় দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্র এলাকায়। অর্থাৎ জ্বালানি নিরাপত্তাকে শুধু আজকের উৎপাদন দিয়ে নয়, আগামী দিনের সম্ভাব্য মজুত খুঁজে বের করার দিক থেকেও দেখা হয়েছিল।
গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থাতেও বড় বিনিয়োগ হয়। পাইপলাইনের দৈর্ঘ্য বাড়ানো হয়। দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়।
এর পাশাপাশি একটি নতুন বাস্তবতাও সামনে আসে। দেশের নিজস্ব গ্যাসের ওপর এককভাবে নির্ভর করে ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি চালানো সম্ভব হবে না। তাই এলএনজি আমদানির অবকাঠামো তৈরি করা হয়। ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে আমদানি করা গ্যাস যুক্ত হতে শুরু করে।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। এলএনজি ছিল দেশীয় গ্যাসের বিকল্প নয়, বরং ঘাটতি সামাল দেওয়ার একটি পরিপূরক ব্যবস্থা। অর্থাৎ সরকার একই সঙ্গে দেশীয় অনুসন্ধান এবং আমদানির ব্যবস্থা এগিয়ে নিয়েছিল।
জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা হয়। তেল সংরক্ষণ ক্ষমতা বাড়ানো হয়। পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল পরিবহনের নতুন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এলপিজি খাতও দ্রুত সম্প্রসারিত হয়।
সব মিলিয়ে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সময়কালে বাংলাদেশের জ্বালানি অবকাঠামো আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বড় ও জটিল হয়ে ওঠে।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে। এত বিনিয়োগ, এত অবকাঠামো এবং এত প্রকল্পের পরও আজ জ্বালানি সংকট দেখা দিচ্ছে কেন?
কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা কোনো একটি সরকারের পাঁচ বছরের প্রকল্প নয়। এটি একটি ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া। একটি কূপ খনন করে তার ফল পাওয়া যায় কয়েক বছর পর। একটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করলেই পরদিন উৎপাদন শুরু করা যায় না। অনুসন্ধান থেকে উৎপাদন, উৎপাদন থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ, সেখান থেকে সঞ্চালন এবং শেষ পর্যন্ত শিল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়।
এই জায়গাতেই বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের জন্য বড় সতর্কবার্তা।
একটি সরকার চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি প্রকল্প থেমে যায়, কূপ খনন থেমে যায়, অনুসন্ধান কমে যায়, রিগ বসে থাকে, পাইপলাইন প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়ে এবং নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকে, তাহলে জ্বালানি নিরাপত্তা খুব দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়বে।
জ্বালানি খাতে সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, আজকের অবহেলার ফল আজই দেখা যায় না। আজ একটি কূপ খনন না করলে তার ঘাটতি হয়তো দুই বছর পর দেখা যাবে। আজ অনুসন্ধান বন্ধ করলে তার প্রভাব পড়বে আরও কয়েক বছর পরে। কিন্তু তখন সমস্যাটি সমাধান করতে গিয়ে সময়ও লাগবে, অর্থও লাগবে।
এই কারণেই আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় না থাকার পর জ্বালানি খাতের চলমান প্রকল্প, অনুসন্ধান কর্মসূচি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব কূপ খনন, ওয়ার্কওভার ও ডিপ ড্রিলিংয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যতে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত গ্যাস যুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল, সেগুলোর ধারাবাহিকতা নষ্ট হলে তার প্রভাব পড়বে সরাসরি উৎপাদন ও সরবরাহে।
আর তখন একটি সহজ রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সামনে আনা খুব সহজ হয়। বলা যায়, আগের সরকার গ্যাস অনুসন্ধান করেনি। কিন্তু জ্বালানি খাতের বাস্তবতা এত সরল নয়।
কারণ নথিভুক্ত তথ্য যদি বলে একটি সময়ে শত শত কূপ খনন হয়েছে, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হয়েছে, গ্যাস উৎপাদন বেড়েছে, নতুন রিগ এসেছে, হাজার হাজার কিলোমিটার সিসমিক জরিপ হয়েছে এবং গ্যাস সঞ্চালন অবকাঠামো সম্প্রসারিত হয়েছে, তাহলে রাজনৈতিক বক্তব্যের আগে সেই তথ্যগুলো নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত।
একইভাবে বর্তমান সংকটের কারণও একমাত্র একটি জায়গায় খুঁজলে চলবে না। দেশীয় উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা, পুরনো কূপের উৎপাদন কমে যাওয়া, নতুন অনুসন্ধানের গতি, আমদানিনির্ভরতা, এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং অবকাঠামোগত ত্রুটি—সবকিছু মিলেই একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা তৈরি হয়।
আর এখানেই বঙ্গবন্ধুর ১৯৭৫ সালের সিদ্ধান্তের গুরুত্ব আজও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তিনি বুঝেছিলেন, বিদেশ থেকে চিরকাল জ্বালানি কিনে একটি দেশের অর্থনীতি নিরাপদ রাখা যায় না। নিজের সম্পদের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। শেখ হাসিনা সেই দর্শনকে নতুন বাস্তবতায় নিয়ে গিয়ে দেশীয় অনুসন্ধান, উৎপাদন বৃদ্ধি, সঞ্চালন অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং আমদানির সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন।
তাঁদের সময়ের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিখুঁত ছিল, এমন দাবি করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার সুযোগ নেই। জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ধারাবাহিক বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পরপরই বুঝেছিলেন এবং শেখ হাসিনা দীর্ঘ সময় ধরে সেই খাতকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রেখেছিলেন।
আজকের সংকট তাই শুধু গ্যাসের সংকট নয়। এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কতটা টেকসই, তারও পরীক্ষা।
রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তন হবে। ক্ষমতার পালাবদল হবে। কিন্তু গ্যাসক্ষেত্র, পাইপলাইন, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা রিগ কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। এগুলো রাষ্ট্রের সম্পদ। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, আগের সরকারের ভালো প্রকল্প বন্ধ করে নতুন করে সবকিছু শুরু করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
কারণ একটি কূপ বন্ধ হয়ে গেলে শুধু একটি কূপের উৎপাদন বন্ধ হয় না। তার সঙ্গে শিল্পের উৎপাদন কমে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা কমে, কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়ে, অর্থনীতির ব্যয় বাড়ে। শেষ পর্যন্ত তার চাপ গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর।
বঙ্গবন্ধু যে কারণে ১৯৭৫ সালে সীমিত অর্থের মধ্যেও গ্যাসক্ষেত্র কিনেছিলেন, তার মূল শিক্ষা ছিল এটাই। একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য আজকের দিনে বিনিয়োগ করতে হয়।
শেখ হাসিনার আমলেও সেই ধারাবাহিকতায় অনুসন্ধান, উৎপাদন, সঞ্চালন ও আমদানির সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা হয়েছে।
এখন সেই ধারাবাহিকতা যদি ভেঙে যায়, তাহলে কয়েক বছর পর তার মূল্য দিতে হবে পুরো বাংলাদেশকে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক হতেই পারে। কিন্তু বিতর্কটা হওয়া উচিত তথ্য ও পরিকল্পনা নিয়ে। কে কতটি কূপ খনন করেছে, কতটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে, কত কিলোমিটার পাইপলাইন করেছে কিংবা কত বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে, তার পাশাপাশি আরও বড় প্রশ্ন হলো আগামী দশ বছর বাংলাদেশের জ্বালানি কোথা থেকে আসবে।
কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা একদিনে তৈরি হয় না। এটি তৈরি করতে দশকের পর দশক লাগে। কিন্তু সেই নিরাপত্তার ভিত ভেঙে দিতে কখনো কখনো কয়েকটি ভুল সিদ্ধান্তই যথেষ্ট।
১৯৭৫ সালের ৯ আগস্ট বঙ্গবন্ধু যে পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র রাষ্ট্রের মালিকানায় এনেছিলেন, সেটি তাই কেবল একটি পুরোনো চুক্তির গল্প নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নেন।
আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সেই দূরদর্শিতার ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে আনা। সরকার বদলাবে, রাজনীতি বদলাবে, কিন্তু বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার পরিকল্পনা যেন না বদলায়। কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা কোনো দলের নয়, এটি বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন।









