চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে পুলিশের অভিযানের সময় লুট হওয়া পুলিশের অস্ত্র দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর গুলি চালানোর ঘটনা ঘটেছে। দীর্ঘ সময় ধরে চালানো অভিযানের একপর্যায়ে ওয়াশরুমের ফলস ছাদে আত্মগোপনে থাকা এক সন্ত্রাসী পুলিশকে লক্ষ্য করে পরপর ছয়টি গুলি ছোড়েন। পরে তাঁর আগ্নেয়াস্ত্র আটকে গেলে তাঁকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম মোবারক হোসেন। তিনি ‘গলা কাটা মোবারক’ নামে পরিচিত। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কারাগারে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং তাঁর ‘দ্বিতীয় প্রধান’ হিসেবে পরিচিত। রাউজানের যুবদল নেতা মাসুদ হত্যাসহ একাধিক সশস্ত্র অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ফটিকছড়ির লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর এলাকায় একটি বাড়িতে মোবারকের অবস্থানের খবর পায় পুলিশ। এরপর রাতেই বাড়িটি ঘিরে ফেলা হয়। বাড়িটির প্রবেশদ্বার লোহার তৈরি হওয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে পুলিশ সদস্যরা ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের দরজা খোলার জন্য আহ্বান জানান। কিন্তু দরজা না খোলায় শেষ পর্যন্ত তা ভেঙে পুলিশ সদস্যরা বাড়িটির ভেতরে প্রবেশ করেন।
অভিযানের সময় পুলিশ সদস্যরা প্রথমে ওয়াশরুমের ওপরের ফলস ছাদে মোবারকের কয়েকজন সহযোগীর অবস্থান শনাক্ত করেন। সেখান থেকে রায়হান, নাছির ও ফরিদকে গ্রেপ্তার করা হয়। ভেতরে আরও কেউ অস্ত্র নিয়ে লুকিয়ে থাকতে পারে—এমন আশঙ্কায় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অভিযান এগিয়ে নেয় পুলিশ।
একপর্যায়ে একটি কক্ষের ওয়াশরুমের ফলস ছাদের ওপর মোবারকের অবস্থান শনাক্ত হয়। পুলিশ সদস্যরা কক্ষে প্রবেশ করতেই তিনি ছাদের ভেতর থেকে গুলি চালাতে শুরু করেন। তাঁর হাতে ছিল ব্রাজিলের তৈরি একটি ‘তরাস’ পিস্তল। তিনি একে একে ছয়টি গুলি ছোড়েন। পুলিশও আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মোবারকের ছোড়া একটি গুলি চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজের কানের পাশ দিয়ে চলে যায়। অভিযানে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারসহ মোট পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হন। আহত অন্য সদস্যদের মধ্যে ফটিকছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রবিউল আলম খান এবং কয়েকজন পুলিশ কনস্টেবল রয়েছেন। তাঁরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
মোবারক সপ্তমবার গুলি ছোড়ার চেষ্টা করলে তাঁর হাতে থাকা পিস্তলটি আটকে যায়। এই সুযোগে পুলিশ তাঁকে ফলস ছাদ থেকে নামিয়ে গ্রেপ্তার করে। পরে তাঁর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ওই পিস্তলটি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উদ্ধার হওয়া পিস্তলটি নতুন কোনো অবৈধ অস্ত্র নয়; এটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া পুলিশের অস্ত্র বলে শনাক্ত করেছে পুলিশ। অর্থাৎ, একসময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যবহৃত অস্ত্রই পরে পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে।
অভিযানে মোবারকের তিন সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে আরও তিনটি পিস্তল, ২৩টি পিস্তলের গুলি এবং চারটি শটগানের গুলি উদ্ধার করা হয়। পরে ফটিকছড়ি ও রাউজানের বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চালানো হয়।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, মোবারক দীর্ঘদিন ধরে ফটিকছড়ি ও রাউজান এলাকার দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে আসছিলেন। পাহাড়ি এলাকায় অবস্থান নেওয়ার কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের কারণে তিনি পাহাড়ি এলাকা ছেড়ে পরিচিত একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মোবারক রাউজানের যুবদল নেতা মাসুদ হত্যাসহ একাধিক হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, সশস্ত্র হামলা ও অন্যান্য অপরাধের অভিযোগও রয়েছে। গত ১৪ মে ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরে এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে চাঁদা না পেয়ে গুলি চালানোর অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে।
গ্রেপ্তারের পর পুলিশের ওপর হামলা এবং অস্ত্র লুটের ঘটনায় দায়ের করা পৃথক মামলায় মোবারকের বিরুদ্ধে রিমান্ড আবেদন করা হয়। আদালত দুই মামলায় চার দিন করে মোট আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র অপরাধীদের হাতে পৌঁছে যাওয়ার বিষয়টি চট্টগ্রামে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর আগেও বিভিন্ন ঘটনায় থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ফলে লুট হওয়া অবশিষ্ট অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
মোবারক গ্রেপ্তারের ঘটনায় ফটিকছড়ি ও রাউজানের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে তাঁর কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্রটি আবারও সামনে এনেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের নিরাপত্তা ও উদ্ধারের বিষয়টি।








