ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্টের পদত্যাগের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে গভীর রাতে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থীকে হয়রানি ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ তুলে প্রভোস্টের অপসারণ দাবি করাকে কেন্দ্র করে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ঘটনার সূচনা হয় রোবটিকস অ্যান্ড মেকাট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহিমের একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে। তিনি অভিযোগ করেন, হলের সিট সংকটসহ বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিয়ে সোচ্চার হওয়ায় তাকে প্রভোস্টের কক্ষে ডেকে এনে দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখা হয়। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে একপর্যায়ে জোরপূর্বক একটি স্বীকারোক্তিমূলক কাগজে সই নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এই ঘটনা জানাজানি হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। তবে পরবর্তীতে হলের প্রভোস্টের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি শিক্ষার্থীদের ওপর কোনো নির্যাতন বা মোবাইল কেড়ে নেওয়ার কথা অস্বীকার করেন।
রোববার রাত ৯টার দিকে শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে হলের প্রশাসনিক ভবনে বিক্ষোভ শুরু করেন এবং প্রভোস্টের কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে তাকে অবরুদ্ধ করেন। আন্দোলনের চরম পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) প্রতিনিধিরা কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচিতে সরাসরি সংহতি ও নেতৃত্ব দেন:
ডাকসুর সমাজকল্যাণ সম্পাদক এ বি জুবায়ের
ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ
ফজলুল হক মুসলিম হল সংসদের সহসভাপতি খন্দকার আবু নাঈম
ফজলুল হক মুসলিম হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক ইমামুল হাসান
রাত সাড়ে ১১টার পর আন্দোলনের রূপ পরিবর্তিত হয়। বিভিন্ন হল থেকে ছাত্রদল ও শিবিরের নেতা-কর্মীরা পৃথক পৃথক মিছিল নিয়ে ফজলুল হক হলে প্রবেশ করতে শুরু করেন। রাত ১২টার দিকে দুই পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা তীব্র আকার ধারণ করে এবং একপর্যায়ে তা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে ফজলুল হক মুসলিম হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক ইমামুল হাসানসহ বেশ কয়েকজন আহত হন।
ঘটনাটি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় শুরু হয়। বিজয় একাত্তর হল শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক তানভীর হাদী আল মায়েদ অভিযোগ করেন, ছাত্রশিবির অন্যান্য হল থেকে বহিরাগতদের এনে মব তৈরির মাধ্যমে আন্দোলন ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে, ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী পাল্টা দাবি করেন, ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে আন্দোলনকে পণ্ড করার অপচেষ্টা করেছে।
একই রাতে একটি ভিডিওচিত্র ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায় অমর একুশে হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক ও শিবির নেতা ওবায়দুর রহমান হাসিব বস্তাভর্তি জুতা নিয়ে হলে প্রবেশ করছেন। শিক্ষার্থীরা তাকে ঘেরাও করে বস্তার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি।
সমগ্র পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ইব্রাহিম জানান, “দুই মূলধারার ছাত্র সংগঠনের রাজনৈতিক রেষারেষির কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীর হয়রানির বিষয়টি ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। উভয় পক্ষই বহিরাগতদের এনে ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করেছে।” তিনি সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার দাবি জানালেও হল কর্তৃপক্ষ দীর্ঘ সময় গড়িমসি করে।
অবশেষে রাত ৩টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি এবং পুলিশ হলের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে অবরুদ্ধ প্রভোস্টকে নিরাপদে উদ্ধার করে। উক্ত সংঘর্ষ ও শিক্ষার্থী হয়রানির ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো শাস্তিমূলক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি।









