খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই জুলাই ২০২৬, ১:৫০ পিএম

সন্তানদের চোখের সামনে বাবাকে পিটিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করার এক বীভৎস দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছিল চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড। দুই মেয়ে আর এক প্রতিবন্ধী ছেলের জন্য ঈদের নতুন পোশাক কিনতে বের হওয়া কৃষক দল নেতা নাছির উদ্দিন আর বাড়ি ফিরতে পারেননি। গত বছরের ২৬ মার্চ রাতে উপজেলার বাড়বকুণ্ডে নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তিনি। এই ঘটনায় নিহতের স্ত্রী মোমেনা খাতুন আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন, যাদের সবাই বিএনপিরই অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। পুলিশ চার আসামিকে গ্রেপ্তার করলেও শেষ পর্যন্ত দলীয় বড় নেতাদের চাপ ও প্রাণনাশের হুমকির মুখে মোমেনা খাতুন নিজেই আদালতে গিয়ে মুচলেকা দিয়ে আসামিদের মুক্ত করতে বাধ্য হন। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও সামাজিক সহিংসতার এক নির্মম বাস্তবতার চিত্র।
গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রায় ২৩ মাসে চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা মিলিয়ে অন্তত ১৩৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, নিহতদের মধ্যে ৫৫ জনই বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। আর এসব খুনের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আসামি হিসেবে নাম এসেছে দলটির শতাধিক পদধারী নেতার।
চট্টগ্রামের তিনটি সাংগঠনিক এলাকার মধ্যে উত্তর জেলার পাঁচ উপজেলা—সীতাকুণ্ড, রাউজান, মিরসরাই, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়িতেই দলীয় কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারের জেরে সবচেয়ে বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে।
সবচেয়ে বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে সীতাকুণ্ড উপজেলায়। এখানে গত ২৩ মাসে রেকর্ড ৩৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যার মধ্যে আটজন নিহত হয়েছেন অভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দলের কারণে। এ ছাড়া এই উপজেলায় মব জাস্টিসের কারণে পাঁচজন, জমিজমার বিরোধে ১৪ জন, পারিবারিক কলহে চার নারী এবং দুই শিশুসহ আরও পাঁচজন প্রাণ হারিয়েছেন। এমনকি জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাবের উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হওয়ার ঘটনায়ও বিএনপির নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। একই এলাকায় ইট-বালুর ব্যবসা ও ছিন্নমূল এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে খুন হন বিএনপি নেতা মোহাম্মদ মাসুদ ও সমর্থক আবুল কালাম।
অন্যদিকে, রাউজান উপজেলায় রাজনৈতিক খুনের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এখানকার ২৬টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ১৯ জনই ছিলেন বিএনপির নেতাকর্মী। যুবদল কর্মী মানিক আবদুল্লাহকে মুখে বন্দুকের নল ঢুকিয়ে এবং কমর উদ্দিন জিতুকে ইফতার মাহফিল নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার জেরে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এই উপজেলার শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হান—যিনি আটটি হত্যা মামলার আসামি এবং বিএনপির নির্বাচনী গণসংযোগেও অংশ নিয়েছেন—তাঁর হাতে খুন হন যুবদল কর্মী আলমগীর ও মো. সেলিম।
মিরসরাই ও জোরারগঞ্জ থানা এলাকার চিত্রও বেশ ভয়াবহ। গত ২১ মাসে এখানে ২৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে যুবদল নেতা রফিক উদ্দিন, বিএনপি নেতা কবির হোসেন, যুবদল কর্মী মুন্না ও জাবেদ হোসেনসহ মোট ৯ জন দলীয় অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া ফটিকছড়ি ও রাঙ্গুনিয়ায় বালু উত্তোলন ও এলাকা দখলকে কেন্দ্র করে অন্তত ১০টি খুনের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে রমজান আলী ও মো. শহীদের মতো কর্মীরা প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হন।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ও মহানগরে সংঘটিত মোট হত্যাকাণ্ড এবং এর মধ্যে বিএনপির নেতাকর্মীদের নিহতের একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
উত্তর চট্টগ্রামের মতো দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোতে রাজনৈতিক খুনের তীব্রতা ততটা না থাকলেও সামাজিক ও পারিবারিক অপরাধের গ্রাফ বেশ ঊর্ধ্বমুখী। পটিয়া উপজেলায় কমপক্ষে ১০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যার মূল কারণ জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ, মাদক ব্যবসা এবং ছিনতাই। এখানকার সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল জমি সংক্রান্ত পারিবারিক বিরোধের জেরে ৫ বছরের শিশু মো. জাইহানকে নৃশংসভাবে হত্যা। এছাড়া ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন পংকজ শীল নামের এক ব্যক্তি।
আনোয়ারা উপজেলায় সংঘটিত ছয়টি হত্যাকাণ্ডের পেছনেও কাজ করেছে আর্থিক লেনদেন ও পারিবারিক কলহ। তবে এখানে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতায় খুন হন নিষিদ্ধ ঘোষিত যুবলীগের কর্মী মোহাম্মদ মানিক। এছাড়া এই উপজেলার চাটরী ও পরৈকোড়া ইউনিয়নে নিজ ঘরে মা এনি বড়ুয়া ও তাঁর দশম শ্রেণী পড়ুয়া মেয়ে প্রিয়ন্তী বড়ুয়াকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাটি পুরো এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল।
চট্টগ্রাম মহানগরীতেও পাঁচটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ডবলমুরিং এলাকায় বাস্তুহারা বিএনপি নেতা নূর আলম, বায়েজিদ বোস্তামীর বার্মা কলোনিতে দলের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে যুবদল কর্মী ইমন এবং চান্দগাঁওয়ে দুই পক্ষের বিরোধে জোবায়ের নামে আরেক যুবদল কর্মী নিহত হন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই অবনতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শওকত আলী স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। তিনি জানান, অপরাধীর পেছনে কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয় বিবেচনা করা হয় না। আসামিদের ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে তদবির এলেও পুলিশ তা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।
মন্তব্য