জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

গ্যাস সংকটে ২৬ দিন ধরে আরপিসিএল বন্ধ, পরিচালক বললেন ‘ড. ইউনূসের দোষ’

তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে টানা ২৬ দিন ধরে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়ে আছে ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিসিএল) ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সব কটি ইউনিট অচল হয়ে পড়ায় এবং আশপাশের দুটি বেসরকারি কেন্দ্রে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসায় পুরো ময়মনসিংহ বিভাগজুড়ে ভয়াবহ লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। দিনরাতের বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় একদিকে বাসাবাড়িতে গৃহস্থালি কাজের পানির সংকট তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে স্থানীয় কারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

তবে এই সংকটের পেছনে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দায়ী করেছেন ময়মনসিংহ আরপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএইচএম রাশেদ। তিনি দাবি করেন, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেল-গ্যাস ও খনিজ পদার্থ সরবরাহের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার চুক্তি করেছিলেন। কিন্তু সেখান থেকে কাঙ্ক্ষিত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে হঠাৎ জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে তাঁদের বিদ্যুৎ উৎপাদনে। এই পরিস্থিতিতে জাতীয় গ্রিড থেকে গ্যাস সরবরাহ পাওয়া না গেলে কেন্দ্রটিতে উৎপাদন ফের চালু করা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৯৭ সালে ময়মনসিংহ অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো এবং সম্ভাবনাময় শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ার লক্ষ্যে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের আওতায় আরপিসিএল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করে এবং সঞ্চালন সংস্থা গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) সেখানে গ্যাস পাইপলাইন বসায়। কিন্তু শুরুর পর থেকেই প্রয়োজনীয় জ্বালানির অভাবে কেন্দ্রটি সক্ষমতার সংকটে ভোগে। বিশেষ করে ২০০৭ সালের পর থেকে দেশে সার্বিক গ্যাস সংকট বাড়তে থাকলে এই কেন্দ্রে গ্যাসের সরবরাহ আরও কমতে থাকে।

প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২১০ মেগাওয়াট উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও গত কয়েক বছর ধরে এটি মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ মেগাওয়াটের বেশি দিতে পারছিল না। আরপিসিএলের বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলেও কেন্দ্রটির ধারাবাহিক অবনতির প্রমাণ মেলে। ২০২১-২২ অর্থবছরে কেন্দ্রটির প্লান্ট ফ্যাক্টর ছিল ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরে নেমে আসে মাত্র ৪৫ শতাংশে। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মাসভিত্তিক উৎপাদন কোনো কোনো সময় ৪০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে যায়। শেষ পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হওয়ায় গত ২৬ দিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে এই কেন্দ্র।

সব মিলিয়ে ময়মনসিংহ অঞ্চলে এখন বিদ্যুৎ বিপর্যয় চরমে পৌঁছেছে। স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, নগরের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা লোডশেডিং দেওয়া হয়। তবে বিদ্যুৎ বিভাগের এই তথ্যকে ভিত্তিহীন বলছেন ভুক্তভোগী বাসিন্দারা। কাঁচিঝুলি এলাকার বাসিন্দা শেফালী আক্তারের মতো অনেকেই জানিয়েছেন, দিনে ও রাতে চারবার করে মোট ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। সেই সঙ্গে রান্নার গ্যাসের সংকট যোগ হওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।

গ্রামাঞ্চলের অবস্থা তো আরও বেশি করুণ। সদরের গোপালনগর এলাকার ভ্যানচালক নাসির উদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, দিনে ও রাতে মিলিয়ে মাত্র ছয় থেকে সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, আর বাকি ১৭-১৮ ঘণ্টাই অন্ধকারে কাটাতে হয়। গত এক দশকে এমন ভয়াবহ অবস্থা আর দেখা যায়নি। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় এই গরমে ছোট শিশু ও বয়স্করা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, ব্যাঘাত ঘটছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায়। পাশাপাশি খামারিরা বিদ্যুৎ সংকটে পড়ে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। দ্রুত এই অচলাবস্থা কাটানোর কোনো সুনির্দিষ্ট আশ্বাস না পেয়ে হতাশ অঞ্চলের সর্বস্তরের মানুষ।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর