সঙ্গীতের বিশাল সাম্রাজ্যে অনেক তারকার জন্ম হয়েছে, আবার কালের নিয়মে অনেকে হারিয়েও গেছেন। কিন্তু কিছু নাম থাকে যা যুগের গণ্ডি পেরিয়ে এক চিরন্তন প্রতীকে পরিণত হয়। ১৯৭৭ সালের ১৬ আগস্ট মাত্র ৪২ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন মার্কিন সঙ্গীতশিল্পী এলভিস প্রিসলি। মৃত্যুর ৪৯ বছর পার হলেও সঙ্গীত জগতে তাঁর নামের আগে অন্য কোনো পরিচয় বসানোর প্রয়োজন পড়ে না—স্রেফ ‘এলভিস’ বললেই বিশ্ব এক নামে চিনে নেয় ‘দ্য কিং অব রক অ্যান্ড রোল’-কে।
এলভিস কেবল একটি ধারার সফল গায়ক ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন আধুনিক পপ সংস্কৃতির এক দূরদর্শী স্থপতি। ১৯৩৫ সালের ৮ জানুয়ারি মিসিসিপির টুপেলোর এক অতি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। শৈশব থেকেই কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গদের বিভিন্ন ধারার গান শুনে বড় হওয়া এই তরুণ ১৯৫৪ সালে মেমফিসের সান রেকর্ডসে ‘দ্যাটস অল রাইট’ গানটি রেকর্ড করে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর ১৯৫৬ সালে আরসিএ-র অধীনে ‘হার্টব্রেক হোটেল’ মুক্তির পর সেটি দ্রুত ১০ লাখ কপি বিক্রি হয় এবং তাঁকে রাতারাতি জাতীয় তারকায় পরিণত করে। তিনি কান্ট্রি, আরঅ্যান্ডবি, ব্লুজ ও গসপেল সংগীতিকে একত্র করে এমন এক উন্মাদনার জন্ম দেন, যা বৈশ্বিক সঙ্গীত মানচিত্রকে বদলে দিয়েছিল।
তবে এলভিসের ঐতিহাসিক সফলতার পেছনে ছিল তীব্র সামাজিক বিতর্ক। ১৯৫০-এর দশকে বর্ণবৈষম্যে বিভক্ত যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীদের তৈরি ব্লুজ ও আরঅ্যান্ডবি সুরকে মূলধারার শ্বেতাঙ্গ শ্রোতাদের কাছে পরিবেশন করার জন্য তাঁকে ‘সাংস্কৃতিক আত্মসাৎকারী’ হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। যদিও আর্থার ক্রুডাপ, বিগ মামা থর্নটন কিংবা বি বি কিংয়ের মতো কৃষ্ণাঙ্গ কিংবদন্তিদের প্রতি তাঁর অগাধ শ্রদ্ধা ও প্রকাশ্য স্বীকৃতি ইতিহাসের অংশ। এ বিতর্ক সত্ত্বেও স্বীকার করতেই হয়, মঞ্চে অনবদ্য নাচ, শরীরী ভাষা এবং পম্পাডোর চুল থেকে শুরু করে রঙিন জ্যাকেট ও ঝলমলে জাম্পস্যুটের ফ্যাশন দিয়ে একজন গায়ককে কীভাবে দৃশ্যমান প্রতীকে রূপ দেওয়া যায়, তা প্রথম দেখিয়েছিলেন এলভিসই।
সংগীতের পাশাপাশি হলিউডেও তাঁর পদচারণা ছিল চোখে পড়ার মতো। গ্রেসল্যান্ডের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ৩১টি ফিচার চলচ্চিত্র ও দুটি কনসার্ট ডকুমেন্টারিতে অভিনয় করেন। কিন্তু ফর্মুলাভিত্তিক সিনেমার গণ্ডিতে আটকে থাকায় তাঁর আসল অভিনয় প্রতিভা পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি। পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালের বিখ্যাত ‘৬৮ কামব্যাক কনসার্ট’ এবং ১৯৭৩ সালে স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে সরাসরি বিশ্বজুড়ে সম্প্রচারিত ‘আলোহা ফ্রম হাওয়াই’-এর মতো ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেন।
ম্যানেজার কর্নেল টম পার্কারের কঠোর ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ, মাত্রাতিরিক্ত প্রেসক্রিপশন ওষুধের ওপর নির্ভরতা এবং খ্যাতির চরম মানসিক চাপ শেষ বয়সে এই রাজাকে গ্রাস করে। তবে শারীরিক মৃত্যুর পরও তাঁর বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য থামেনি। ভিনাইল, ক্যাসেট, সিডি থেকে শুরু করে ডিজিটাল যুগেও বিশ্বজুড়ে তাঁর রেকর্ড বিক্রির সংখ্যা এক বিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে। মেমফিসের ‘গ্রেসল্যান্ড’ আজও সংগীপ্রেমীদের তীর্থস্থান, যেখানে ভক্তরা প্রতিবছর জমা হন ‘দ্য কিং’-এর মহিমাকে স্মরণ করতে। এলভিস প্রমাণ করেছেন, মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও সৃষ্টিশীল রাজত্ব কখনো মুছে যায় না।









