দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে কারখানার ফটকে বর্তমানে দুটো চিত্র দেখা যাচ্ছে—কোথাও ‘স্থায়ীভাবে বন্ধের’ নোটিশ, আবার কোথাও ঝুলছে ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ছুটির’ ঘোষণা। দুটি নোটিশ আপাতদৃষ্টিতে আলাদা মনে হলেও উভয়ের পেছনেই রয়েছে গভীর সংকট। নিয়মিত গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতি, বৈদেশিক ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, তীব্র আর্থিক দুরবস্থা, শ্রম অসন্তোষ এবং ব্যাংক ঋণের চাপে বাংলাদেশের শিল্প খাত এখন এক অভূতপূর্ব অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
শিল্প পুলিশ, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং গণমাধ্যমের ২১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যাবলীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক মাসে একদিকে যেমন একের পর এক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে, অন্যদিকে শত শত প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন কমিয়ে সাময়িক ছুটির পথ বেছে নিয়েছে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবগুলোতে স্থায়ী বন্ধ, অনির্দিষ্টকালের বন্ধ, শ্রম আইনের বিশেষ ধারায় বন্ধ এবং সাময়িক ছুটি—এসব তথ্য আলাদাভাবে সংরক্ষণ করায় সামগ্রিক চিত্র বুঝতে পৃথক কয়েকটি পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
ছয় মাসের তথ্য (২০২৬): ২৭ কারখানা বন্ধ ও প্রায় ২০ হাজার চাকরিচ্যুতি
চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের পরিসংখ্যান বলছে, বিজিএমইএ-র সদস্যভুক্ত অন্তত ৮০টি কারখানায় আনুমানিক ১৯ হাজার ১৮৮ জন শ্রমিক ছাঁটাই কিংবা চাকরিচ্যুত হয়েছেন। এর মধ্যে শিল্প পুলিশ ও তৈরি পোশাক খাতের তৈরি বিভিন্ন বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, অন্তত ২৭টি কারখানা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেছে। ক্রয়াদেশের অভাব, ব্যাংক ঋণের জটিলতা, বকেয়া মজুরি নিয়ে অসন্তোষ এবং জ্বালানি সংকটের কারণে বড় কারখানাগুলোর পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সাত মাসের আঞ্চলিক চিত্র: ৩ শিল্পাঞ্চলে বন্ধ ৯৫ কারখানা
আঞ্চলভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে শিল্প খাতের বাস্তব রূপ আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। গত সাত মাসে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে মোট ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন প্রায় ৬১ হাজার ৮৮১ জন শ্রমিক-কর্মচারী।
জেলাভিত্তিক কারখানা বন্ধের পরিসংখ্যান:
গাজীপুর: মোট ৫৪টি কারখানা বন্ধ হয়েছে, যার প্রায় সবই তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের অন্তর্ভুক্ত। শুধু এই একটি জেলাই ৪৫ হাজার ৭৩২ জন কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। বিশেষ করে বেক্সিমকো শিল্পপার্কের কারখানা বন্ধের প্রভাব পড়েছিল সবচেয়ে বেশি।
সাভার-আশুলিয়া-ধামরাই: বন্ধ হওয়া ১৮টি তৈরি পোশাক কারখানায় কর্মহীন হয়েছেন অন্তত ১০ হাজার ১২৭ জন শ্রমিক।
নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী: বন্ধ হয়েছে ২৩টি ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
উল্লেখ্য, ছয় মাসে ২৭টি কারখানা বন্ধের হিসাব এবং সাত মাসে ৯৫টি কারখানা বন্ধের অঞ্চলভিত্তিক হিসাব—দুটো সম্পূর্ণ আলাদা পরিধির পরিসংখ্যান। ফলে এই দুটি সংখ্যা যোগ করা সঠিক নয়, বরং উভয়ই দেশের শিল্প সংকটের দুটি ভিন্ন চিত্রকে নির্দেশ করে।
যেসব বন্ধ কারখানার নাম জানা গেছে
শিল্প পুলিশের বরাত দিয়ে চিহ্নিত বেশ কয়েকটি বন্ধ কারখানার তালিকা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
গাজীপুর: টিএমএস অ্যাপারেলস, নায়াগ্রা টেক্সটাইল, মাহমুদ জিন্স, হার্ডি টু এক্সেল, পলিকন লিমিটেড, অ্যাপারেল প্লাস, মাহমুদ জিন্স অ্যাপারেলস, টিআরজেড এবং দ্য ডেল্টা নিট। পাশাপাশি গাজীপুরের বোর্ডবাজারের ‘ইউনিক ওয়াশিং অ্যান্ড ডাইং লিমিটেড’ ও ‘ইউনিক ডিজাইনার্স লিমিটেড’ গত ১৬ জুন থেকে স্থায়ীভাবে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এতে প্রায় ১,৮০০ শ্রমিক অনিশ্চয়তায় পড়েছিলেন, যা পরবর্তীতে সমঝোতা বৈঠকের মাধ্যমে বকেয়া পাওনা নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত হয়।
সাভার-আশুলিয়া-ধামরাই: জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশন, বেস্ট ওয়ান সোয়েটার, এমএস সোয়েটার, সাভার স্পোর্টসওয়্যার, বার্ডা গ্রুপ, র্যামস ফ্যাশন অ্যান্ড এমব্রয়ডারি, প্রিয়াঙ্কা ফ্যাশন এবং জাভান টেক্স নিটওয়্যার।
নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী: গ্রিন বাংলা হোম টেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, এশিয়ান ফ্যালকন গার্মেন্টস, জিএল ফ্যাশন, মাস্টার টেক্সটাইল, ওয়েস্ট বেস্ট অ্যাটায়ার্স এবং স্টার কাটিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং।
অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হওয়া কারখানাসমূহ
শ্রম বিরোধ ও পাওনা পরিশোধ না করার কারণে বেশ কিছু কারখানা অনির্দিষ্টকালের বন্ধের তালিকায় যুক্ত হয়েছে। ১ এপ্রিল আশুলিয়ার ‘ফ্যাশন ফোরাম লিমিটেড’ ও ‘জেএ অ্যাপারেলস’ বন্ধের নোটিশ টানায়, যাতে প্রায় ৪ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। আবার জুলাইয়ের প্রথমার্ধে গাজীপুরের ‘লিথী গ্রুপের’ পাঁচটি কারখানা এবং ‘ইসলাম গার্মেন্টস’ শ্রম অসন্তোষের কারণে অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্যক্রম বন্ধ রাখে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো পরবর্তীতে পুনরায় চালু হয়েছে কিনা সে সংক্রান্ত চূড়ান্ত তথ্য নিশ্চিত না হওয়ায় এগুলোকে স্থায়ী বন্ধের তালিকায় সরাসরি যুক্ত করা যায়নি।
দুই বছরের বৃহৎ পরিসংখ্যান (আগস্ট ২০২৪ – জুন ২০২৬)
দীর্ঘমেয়াদী তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আগস্ট ২০২৪ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত দেশের সাতটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে মোট ৪৫৭টি শিল্প ইউনিট স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
বন্ধ হওয়া ৪৫৭টি প্রতিষ্ঠানের খাতভিত্তিক তালিকা:
১০৮টি বিজিএমইএ সদস্যভুক্ত কারখানা
৩৫টি বিকেএমইএ সদস্যভুক্ত কারখানা
৮টি বিটিএমএ সদস্যভুক্ত কারখানা
১৯টি বেপজা-সংশ্লিষ্ট কারখানা
২৮৭টি পোশাকবহির্ভূত অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান
এই কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বৈশ্বিক ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, মালিকদের ভয়াবহ আর্থিক সংকট, শ্রম অস্থিরতা, ব্যাংক ঋণ পরিশোধের জটিলতা, কাঁচামালের অভাব এবং সাম্প্রতিক চরম জ্বালানি সংকট।
জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন বন্ধের নতুন ধারা
কারখানা স্থায়ী বন্ধের পাশাপাশি জ্বালানি সংকটের কারণে সাময়িক ছুটির প্রবণতা তৈরি হয়েছে। আগস্ট ২০২৬-এর শুরুতে গাজীপুরে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটের ফলে প্রায় ১৭ থেকে ২০ শতাংশ কারখানা (আনুমানিক ৭০০ থেকে ৮০০টি) ৩ থেকে ৪ দিনের জন্য ছুটি দিতে বাধ্য হয়।
সবশেষ ২০ আগস্ট ২০২৬ (বৃহস্পতিবার) ময়মনসিংহের ভালুকা শিল্পাঞ্চলে তীব্র গ্যাস সংকটে ২০টি কারখানায় দুপুরের মধ্যেই সাময়িক ছুটি ঘোষণা করা হয়। শিল্প পুলিশ-৫ এর পুলিশ সুপার মো. আনছার উদ্দিন জানান, ওই অঞ্চলের ২৯৩টি কারখানার মধ্যে ৯৯টি সম্পূর্ণ গ্যাসনির্ভর। গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় কারখানাগুলোর মোট উৎপাদন গড়ে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর ব্যবহার করে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করা হলেও তা খরচের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকটের কারণে কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। ফলে বাড়তি খরচে ডিজেল, এলপিজি বা সিএনজি ব্যবহার করতে গিয়ে উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু ক্রেতাদের সাথে চুক্তিকৃত পণ্যের মূল্য আগে থেকেই নির্ধারিত থাকায় এই অতিরিক্ত ব্যয় সমন্বয় করা যাচ্ছে না, যা ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোকে দ্রুত দেউলিয়া হওয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিজিএমইএ-র সাবেক পরিচালক এবং ‘বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস’-এর প্রধান নির্বাহী মহিউদ্দিন রুবেল মত প্রকাশ করেন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করা না গেলে এই সাময়িক ছুটিগুলোই একসময় স্থায়ী বন্ধে রূপান্তরিত হবে। কারখানা সাময়িক বন্ধ থাকলেও শ্রমিকের বেতন, ব্যাংক ঋণের সুদ এবং অন্যান্য স্থায়ী পরিচালন ব্যয় বন্ধ থাকে না। একইসাথে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারের আস্থা নষ্ট হয় এবং নতুন অর্ডার আসা বন্ধ হয়ে যায়।
একটি কারখানা বন্ধের মাশুল কেবল মালিক বা একটি নির্দিষ্ট ভবন দেয় না। এর সাথে সরাসরি যুক্ত থাকে হাজার হাজার শ্রমিক পরিবারের দৈনিক রুটিন, বাসস্থান, সন্তানের শিক্ষা, স্থানী বাজারব্যবস্থা এবং সর্বোপরি দেশের মোট রপ্তানি আয়।









