খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ই মে ২০২৬, ১০:৪৩ পিএম

ব্যাংক খাতের ঋণ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনে একক ঋণগ্রহীতা বা শিল্প গ্রুপের জন্য ঋণসীমা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে কোনো একটি ব্যাংক তার মোট মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ কোনো একক ঋণগ্রহীতা বা শিল্প গ্রুপকে দিতে পারবে। এর আগে এই সীমা ছিল ১৫ শতাংশ। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নতুন এই নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে। একই সঙ্গে পূর্বের ১৫ শতাংশ ঋণসীমা ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলো বড় করপোরেট গ্রুপ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং আমদানিনির্ভর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জন্য আগের তুলনায় বেশি ঋণ সুবিধা দিতে পারবে। বিশেষ করে ট্রেড ফাইন্যান্স বা বাণিজ্য অর্থায়ন কার্যক্রমে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের ফলে ঋণ বিতরণের পরিসর কীভাবে বাড়বে, তা একটি উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়। কোনো ব্যাংকের মূলধন যদি ১ হাজার কোটি টাকা হয়, তাহলে আগের নিয়ম অনুযায়ী সেই ব্যাংক কোনো একটি গ্রুপকে সর্বোচ্চ ১৫০ কোটি টাকা ঋণ দিতে পারত। নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার পর একই ব্যাংক এখন একটি গ্রুপকে সর্বোচ্চ ২৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে। অর্থাৎ, একই মূলধনের বিপরীতে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে।
এ ছাড়া একক ঋণগ্রহীতা সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে নন-ফান্ডেড ঋণের ঝুঁকি-ভারেও পরিবর্তন এনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নন-ফান্ডেড ঋণের মধ্যে সাধারণত লেটার অব ক্রেডিট (এলসি), ব্যাংক গ্যারান্টি এবং অন্যান্য শর্তসাপেক্ষ দায় অন্তর্ভুক্ত থাকে। এসব সুবিধা সরাসরি নগদ ঋণ না হলেও ব্যাংকের দায় হিসেবে বিবেচিত হয় এবং একক ঋণসীমা গণনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নন-ফান্ডেড ঋণের মোট মূল্যের মাত্র ২৫ শতাংশ একক ঋণসীমার আওতায় গণনা করা হবে। এর আগে এই হার ছিল ৫০ শতাংশ। ফলে ব্যাংকগুলোর জন্য এ ধরনের অর্থায়ন সুবিধা প্রদানে বাড়তি সুযোগ তৈরি হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, আগে কোনো গ্রাহকের জন্য ১০০ কোটি টাকার একটি এলসি খোলা হলে তার মধ্যে ৫০ কোটি টাকা একক ঋণসীমার অংশ হিসেবে গণনা করা হতো। নতুন নিয়মে একই এলসির ক্ষেত্রে মাত্র ২৫ কোটি টাকা গণনায় ধরা হবে। এর ফলে ব্যাংকগুলো একই সীমার মধ্যে আরও বেশি এলসি সুবিধা দিতে পারবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য লেনদেনে বড় গ্রাহকদের জন্য অর্থায়ন সম্প্রসারণ সহজ হবে।
ব্যাংকারদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চলমান চাপ, আমদানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং বড় শিল্প ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বাড়তি চলতি মূলধনের চাহিদা মোকাবিলায় এই নীতিগত শিথিলতা সহায়ক ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান আমদানিনির্ভর উৎপাদন ও বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত, তারা দ্রুত এই সুবিধা পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আর্থিক খাতের কিছু বিশেষজ্ঞ সতর্কতাও জানিয়েছেন। তাদের মতে, একক ঋণগ্রহীতা সীমা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে ব্যাংকগুলোর ঋণ ঝুঁকি নির্দিষ্ট কয়েকটি বড় শিল্প গ্রুপের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কা বাড়তে পারে। কোনো বড় করপোরেট গ্রুপ ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তার প্রভাব সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে পড়তে পারে এবং তা সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতেও চাপ তৈরি করতে পারে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, বড় শিল্প গ্রুপগুলোর মধ্যে ঋণের অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২২ সালে একক ঋণগ্রহীতা সীমা সংক্রান্ত নীতিমালা আরও কঠোর করেছিল। সে সময় ব্যাংক খাতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং ঋণ বিতরণে বৈচিত্র্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই সীমা নির্ধারণে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়।
সাম্প্রতিক এই সিদ্ধান্তকে ব্যাংকিং খাতের তারল্য ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্য অর্থায়ন সচল রাখার একটি তাৎক্ষণিক নীতিগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি মূল্যায়ন, ঋণ বিতরণে সতর্কতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি কার্যক্রমের ওপর।
মন্তব্য