বীমা খাতের ডিজিটাল রূপান্তর: শীর্ষস্তরে পৌঁছাতে পেরেছে মাত্র ৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান

বিশ্বজুড়ে বীমা খাতে ডিজিটাল রূপান্তরের পেছনে ব্যাপক বিনিয়োগ সত্ত্বেও প্রত্যাশিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান। সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের বৃহত্তম বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মাত্র ৭ শতাংশ নিজেদেরকে শীর্ষস্থানীয় ‘ডিজিটাল কম্পিটিটর’ বা ডিজিটাল প্রতিযোগী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে প্রবেশের চেষ্টা থাকলেও বীমা খাতের একটি বড় অংশ এখনো পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।

গবেষণার প্রেক্ষাপট ও মূল ফলাফল

‘এসিওআরডি’ (ACORD) পরিচালিত ‘২০২৬ ইন্স্যুরেন্স ডিজিটাল মেচিউরিটি স্টাডি’ শীর্ষক এই গবেষণায় বিশ্বের ২১০টি বড় বীমা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রপার্টি অ্যান্ড ক্যাজুয়ালটি (P&C), জীবন বীমা এবং রিইন্সুরেন্স বা পুনঃবীমা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী:

  • বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তাদের ভ্যালু চেইন বা মূল্য শৃঙ্খল সম্পূর্ণরূপে ডিজিটাল করতে সক্ষম হয়েছে।

  • ডিজিটাল পরিপক্কতার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাতে পেরেছে ১০ শতাংশেরও কম (৭%) প্রতিষ্ঠান।

  • অধিকাংশ বীমা প্রতিষ্ঠানই বর্তমানে ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্যবর্তী পর্যায়ে অবস্থান করছে।

প্রযুক্তিগত অদক্ষতা ও ব্যবধানের কারণ

এসিওআরডি-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শীর্ষস্থানীয় এবং পিছিয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যবধানের প্রধান কারণ কেবল বিনিয়োগের পরিমাণ নয়। বরং প্রতিষ্ঠানগুলো কত দ্রুত এবং কার্যকরভাবে ডিজিটাল সক্ষমতাকে ব্যবসায়িক ফলাফলে রূপান্তর করতে পারছে, সেটিই এখানে মূল ভূমিকা পালন করছে।

এসিওআরডি-এর গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেভ স্টার্নার জানান, অনেক বীমা প্রতিষ্ঠান এখনো তাদের ব্যাক-অফিস পরিচালনার ক্ষেত্রে সেকেলে বা ম্যানুয়াল পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে ডিজিটাল উদ্যোগগুলোকে প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে না দেখে আলাদা প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে প্রযুক্তি, তথ্য, পরিচালনা পদ্ধতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা দিচ্ছে। যারা এই উপাদানগুলোকে একটি সমন্বিত কৌশলের অধীনে আনতে পেরেছে, তারাই বর্তমানের জটিল বাজার ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার অবস্থানে রয়েছে।

ডিজিটাল পরিপক্কতার পাঁচটি শ্রেণিবিভাগ

গবেষণায় ডিজিটাল সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে:

১. ডিজিটাল কম্পিটিটর (৭%): এরা প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারে দক্ষ এবং ব্যবসায়িকভাবে সবচেয়ে সফল। ২. ডিজিটাল ফার্ম (২৩%): এই প্রতিষ্ঠানগুলো উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ডিজিটাল কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ৩. ডিজিটাল অ্যাসপিরেশন (৪৩%): এই বৃহৎ অংশটি ডিজিটাল খাতে বিনিয়োগ করলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ সুফল ভোগ করতে পারছে না। ৪. লোকালাইজড ডিজিটাল ফার্ম (২০%): এদের ডিজিটাল কার্যক্রম প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট কিছু বিভাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ৫. ডিজিটাল ল্যাগার্ড (৭%): এরা প্রযুক্তিগত দিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে।

আর্থিক পারফরম্যান্স ও বিনিয়োগকারীর মুনাফা

ডিজিটাল সক্ষমতার সাথে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সাফল্যের সরাসরি সম্পর্ক এই গবেষণায় উঠে এসেছে। ‘ডিজিটাল কম্পিটিটর’ বা শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোই একমাত্র দল যারা গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় গড় মুনাফার হার ছাপিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।

শেয়ারহোল্ডারদের দীর্ঘমেয়াদী রিটার্ন বা মুনাফা প্রদানের ক্ষেত্রেও এই প্রতিষ্ঠানগুলো অনন্য সাফল্য দেখিয়েছে। গত ১০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে:

  • ডিজিটাল কম্পিটিটর: মোট শেয়ারহোল্ডার রিটার্ন অর্জন করেছে ২৫৪%।

  • ডিজিটাল ফার্ম: রিটার্ন পেয়েছে ১৮০%।

  • ডিজিটাল অ্যাসপিরেশন: এই শ্রেণির প্রতিষ্ঠানগুলো ১৫৪% রিটার্ন নিশ্চিত করতে পেরেছে।