বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, মানুষের জীবনযাপন ও ভ্রমণসম্ভাবনাকে আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে তুলে ধরে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন সংগীতশিল্পী ও অভিনেত্রী মাশা ইসলাম। জার্মান সম্প্রচারমাধ্যম ডয়চে ভেলের ভ্রমণভিত্তিক আয়োজন ডিডব্লিউ ট্রাভেলে তাঁর উপস্থিতির একটি দুই মিনিট ২২ সেকেন্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর দর্শকদের মধ্যে বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার ডিডব্লিউ ট্রাভেলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায় ভিডিওটির সংক্ষিপ্ত অংশ প্রকাশ করা হয়। সেখানে মাশাকে জার্মান সাংবাদিক ও উপস্থাপক এমা ক্রেমারের সঙ্গে ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ঘুরতে এবং বাংলাদেশের নানা দিক নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়। ভিডিওটি প্রকাশের পরপরই দর্শকদের কাছ থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া আসে। অনেকে মাশার স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থাপনা, সাবলীল কথাবার্তা এবং দেশের পরিচিত স্থানগুলোকে নতুনভাবে তুলে ধরার ধরনটির প্রশংসা করেন।
প্রকাশিত ভিডিওটি অবশ্য পুরো আয়োজন নয়, বরং মূল ভ্রমণভিত্তিক সিরিজের একটি ঝলক। মাশার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশজুড়ে একটি ভ্রমণ সিরিজ নির্মাণ ও উপস্থাপনার জন্য তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। সেই সূত্রেই তিনি এই আন্তর্জাতিক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হন। সিরিজটিতে তিনি উপস্থাপক হিসেবে কাজ করেছেন এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে সেখানকার ইতিহাস, সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও মানুষের গল্প তুলে ধরেছেন।
মাশার সঙ্গে পুরো কাজটিতে ছিলেন এমা ক্রেমার। বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় রূপকে ভিন্ন ভিন্ন গল্পের মাধ্যমে দর্শকদের সামনে তুলে ধরতে সিরিজটিতে মোট ১০টি গল্প রাখা হয়েছে। বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষাতেই উপস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেছেন মাশা। ফলে স্থানীয় দর্শকদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছেও বাংলাদেশের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এই কাজের জন্য বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চল ঘুরেছেন মাশা ও তাঁর সহকর্মীরা। রাজধানী ঢাকার ঐতিহাসিক আহসান মঞ্জিল ও লালবাগ কেল্লার মতো স্থাপনা পরিদর্শনের পাশাপাশি তাঁরা গেছেন সিলেট শহর, শ্রীমঙ্গল ও কক্সবাজারে। এসব ভ্রমণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পাশাপাশি প্রকৃতি, স্থানীয় জীবনযাপন এবং পর্যটনের বৈচিত্র্যকে সামনে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
মাশার নিজের কাছেও এই অভিজ্ঞতা ছিল বিশেষ। সংগীতশিল্পী হিসেবে কাজের বাইরে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোর ছবি ও গান পরিবেশনের ভিডিওও নিয়মিত দেখা গেছে তাঁর। তাই ভ্রমণের প্রতি ব্যক্তিগত আগ্রহের সঙ্গে পেশাগত কাজের এই সমন্বয় তাঁর জন্য আনন্দের ছিল। তবে এবার পার্থক্য ছিল অন্য জায়গায়—নিজের দেশের গল্প নিজেই আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
মাশার শিল্পীজীবনের শুরু অবশ্য সংগীতকে ঘিরেই। ২০১৫ সাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন জনপ্রিয় গানের নিজস্ব পরিবেশনা প্রকাশ করে পরিচিতি পেতে শুরু করেন তিনি। ইউটিউব ও ফেসবুকে তাঁর গান ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয় নিজস্ব দর্শক-শ্রোতাগোষ্ঠী। ধীরে ধীরে সংগীতাঙ্গনের পেশাদারদের নজরে আসেন এবং প্লেব্যাকেও নিয়মিত কাজের সুযোগ পান।
পরবর্তী সময়ে ‘টেকা পাখি’, ‘একটুখানি মন’ ও ‘যেতে যেতে’সহ তাঁর কয়েকটি গান শ্রোতাদের মধ্যে পরিচিতি তৈরি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে নিজের অবস্থান তৈরি করা মাশার ক্যারিয়ারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য বা গন্তব্য ঠিক করে তিনি পথচলা শুরু করেননি। নিজের ভালো লাগার জায়গা থেকে নিয়মিত কাজ করে যাওয়াই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য।
সংগীতের পাশাপাশি অভিনয়েও পা রেখেছেন মাশা। চলতি বছরের পবিত্র ঈদুল ফিতরে তানিম নূরের ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ দিয়ে তাঁর অভিনয়ে অভিষেক হয়। প্রথম কাজের পর অভিনয়ের ক্ষেত্রটি নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়েছে তাঁর মধ্যে। ভবিষ্যতে ভালো গল্প ও চরিত্রের সুযোগ পেলে অভিনয়ে আরও কাজ করতে চান তিনি।
ভ্রমণ নিয়েও রয়েছে তাঁর আলাদা পরিকল্পনা। দীর্ঘদিন ধরেই নিজের ইউটিউব চ্যানেলে ভ্রমণভিত্তিক ভিডিও বা অনুষ্ঠান শুরু করার ইচ্ছা রয়েছে। কাজের ব্যস্ততার কারণে এখনো সেটি শুরু করা সম্ভব হয়নি। তবে দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াতের অভিজ্ঞতা এবং ভ্রমণের প্রতি নিজের আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চান মাশা।
এর পাশাপাশি বর্তমানে নিজের মৌলিক গানের অ্যালবাম নিয়েও কাজ করছেন তিনি। অ্যালবামের গানগুলো পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে দুটি গান সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়েছে। অর্থাৎ সামনে মাশাকে একসঙ্গে সংগীত, অভিনয় ও ভ্রমণভিত্তিক কাজ—তিন ক্ষেত্রেই দেখা যেতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, আন্তর্জাতিক ভ্রমণভিত্তিক আয়োজনে বাংলাদেশের গল্প বলার সুযোগ পাওয়া সেই পথচলায় নতুন একটি অধ্যায় যোগ করেছে। একজন শিল্পী হিসেবে নিজের পরিচিতির গণ্ডি পেরিয়ে দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মানুষের গল্প তুলে ধরার এই অভিজ্ঞতা মাশার কাজের পরিধিকেও আরও বিস্তৃত করেছে।









