জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

চাঁদা দাবির অভিযোগের পর কারখানায় ম্যানেজারের মৃত্যু

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগের পর একটি জুট কারখানার ব্যবস্থাপকের আকস্মিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহত শাহজাহান ভূঁইয়া উপজেলার ফুড অফিসার্স যমুনা জুট ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপক ছিলেন। তাঁর স্বজন ও সহকর্মীদের বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েক দিন ধরে কারখানায় এসে তাঁকে ভয়ভীতি দেখানো এবং টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল। এর মধ্যেই ২৪ আগস্ট বিকেলে তিনি কারখানার ভেতর গুরুতর অসুস্থ হয়ে মারা যান।

ঘটনার পর ওয়ারেস, শামীম ও লিখন নামে তিনজনের বিরুদ্ধে ভূঞাপুর থানায় চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে। মামলার বাদী কারখানার তত্ত্বাবধায়ক মো. আক্তার হোসেন। পুলিশ জানিয়েছে, মামলার আসামিরা নিজেদের বিএনপির কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

কারখানা সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, ২২ আগস্ট অভিযুক্তরা কারখানায় গিয়ে ব্যবস্থাপকের কক্ষে প্রবেশ করেন। সেখানে তাঁর কাছে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি ও বিভিন্নভাবে ভয় দেখানো হয়। কারখানার নিরাপত্তা ক্যামেরায় ধারণ করা দৃশ্যে কয়েকজন ব্যক্তিকে ব্যবস্থাপকের কক্ষে গিয়ে কথা বলতে দেখা গেছে। পুলিশ বলছে, ওই দৃশ্য এবং শ্রমিকদের বক্তব্য পর্যালোচনার পর চাঁদা দাবির অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।

শ্রমিকদের ভাষ্য, ঘটনার শুরু ২২ আগস্টে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর আগেও কয়েক দিন ধরে অভিযুক্তদের কয়েকজন কারখানায় আসতেন। ব্যবস্থাপকের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলতেন এবং টাকা দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করতেন। একপর্যায়ে অফিসের ভেতরে চেয়ার ছুড়ে মারার মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে শ্রমিকদের অভিযোগ।

কারখানার শ্রমিক রশীদ বলেন, ওয়ারেস কয়েক দিন ধরে তাঁর কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে কারখানায় আসতেন। পরে তাঁরা জানতে পারেন, ব্যবস্থাপকের কাছে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছে। এ নিয়ে শাহজাহান ভূঁইয়া মানসিকভাবে খুব চাপে ছিলেন বলেও তিনি জানান।

আরেক শ্রমিক লিয়াকত আলী বলেন, কয়েকজন ব্যক্তি প্রথমে কারখানার ফটকে এসে ব্যবস্থাপকের সঙ্গে দেখা করতে চান। পরে তাঁরা তাঁর কক্ষে ঢুকে দীর্ঘ সময় ধরে ভয়ভীতি দেখান। চাঁদা না দিলে পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা চালানোর হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও তাঁর দাবি।

কারখানার হিসাবরক্ষক ইয়াসিন আরাফাত বলেন, অভিযুক্তরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে টাকা চাইতেন। কখনও দলের কাজের কথা বলা হতো, আবার কখনও কারখানার সামনের রাস্তা মেরামতের জন্য অর্থ প্রয়োজন বলে জানানো হতো। টাকা না দিলে কারখানায় চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।

ইয়াসিনের ভাষ্য, পরিস্থিতি সামাল দিতে শাহজাহান ভূঁইয়া মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেন। পরে কিছু টাকা দেওয়ার বিষয়ে সম্মতিও হয়েছিল। ২৪ আগস্ট বিকেলে ওয়ারেস ফোন করে জানায়, তারা টাকা নিতে আসছে। এর কিছুক্ষণ পরই ব্যবস্থাপক হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে কারখানার ভেতরেই তাঁর মৃত্যু হয়।

কারখানার মেঝে বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আশরাফ বলেন, শাহজাহান ভূঁইয়া ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর কাছেও ওয়ারেস টাকা দাবি করেছিলেন বলে তিনি দাবি করেন।

প্রায় ৪০০ শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সঙ্গে কারখানাটির কার্যক্রম জড়িত বলে শ্রমিকেরা জানিয়েছেন। ফলে ব্যবস্থাপকের মৃত্যুর ঘটনায় শুধু কর্মীদের মধ্যেই নয়, কারখানার ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শ্রমিক লিয়াকত আলী বলেন, কারখানাটি বন্ধ হয়ে গেলে তাঁদের পরিবারগুলো বিপাকে পড়বে। তাঁর ভাষ্য, কারখানার আয়-ব্যয়ের বাস্তবতায় পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দেওয়া সম্ভব নয়।

তবে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত ওয়ারেসের বাবা আসলাম। তাঁর দাবি, কারখানার সামনের রাস্তায় বালু থাকায় স্থানীয়দের চলাচলে সমস্যা হচ্ছিল। রাস্তা মেরামতের জন্য এলাকার বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে অর্থ চাওয়া হয়েছিল এবং সেই কারণেই কারখানার ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা বলা হয়েছিল। তবে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা চাওয়ার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে দাবি করেন।

এদিকে শাহজাহান ভূঁইয়ার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, পরিবারকে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা না বলার জন্য স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষ থেকে চাপ দেওয়া হয়েছে। তবে এই অভিযোগের স্বাধীনভাবে কোনো সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে ভূঞাপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিমুজ্জামান তালুকদার সেলু বলেন, তিনি ঘটনাটি শুনেছেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রশাসন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত অপকর্মের দায় দল নেবে না বলেও তিনি জানান।

ভূঞাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, তিনজনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা করা হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন, শ্রমিকদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং নিরাপত্তা ক্যামেরার দৃশ্য পর্যালোচনার পর চাঁদা দাবির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় মামলাটি নেওয়া হয়েছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে আইনগত প্রক্রিয়া ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

শাহজাহান ভূঁইয়ার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং চাঁদা দাবির ঘটনায় অভিযুক্তদের ভূমিকা এখন তদন্তের বিষয়। চাঁদা দাবির অভিযোগ ও তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক ছিল কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

Tags :

SHOWRAV BISHWAS

সর্বশেষ খবর