দেশের নাটক ও চলচ্চিত্রে প্রেম, পরকীয়া এবং বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের গল্পের আধিক্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে আইনি নোটিশ পাঠানো সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুনকে ঘিরে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। নোটিশ পাঠানোর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার কয়েকটি পুরোনো পোস্ট ছড়িয়ে পড়েছে। এসব পোস্টে তাকে বিভিন্ন রোমান্টিক ও প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকদের জন্য নির্মিত চলচ্চিত্র দেখার কথা জানাতে দেখা যায়। ফলে তার সাম্প্রতিক অবস্থান এবং অতীতের বিনোদন পছন্দ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রশ্ন উঠছে।
মাহমুদুল হাসান মামুন সম্প্রতি জনস্বার্থের কথা উল্লেখ করে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কাছে ওই আইনি নোটিশ পাঠান। এতে টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রে প্রেম এবং সম্পর্ককেন্দ্রিক গল্পের অতিরিক্ত উপস্থিতি নিয়ে আপত্তি জানানো হয়। বিশেষ করে পরকীয়া ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে বিনোদনের উপাদান হিসেবে উপস্থাপনের কারণে তরুণ সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে নোটিশে দাবি করা হয়েছে।
তবে নোটিশের বিষয়টি সামনে আসার পর তার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পুরোনো কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। তার ফেসবুকের আগের পোস্টগুলো ঘেঁটে দেখা যায়, তিনি বিভিন্ন সময়ে প্রেম ও রোমান্সনির্ভর চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। গত বছরের ৫ আগস্ট তিনি ভারতীয় রোমান্টিক নাট্যধর্মী চলচ্চিত্র ‘রাধে শ্যাম’ দেখার কথা উল্লেখ করেন। এর আগে একই বছরের ৯ মে হলিউডের কল্পনাধর্মী রোমান্টিক চলচ্চিত্র ‘স্টারডাস্ট’ দেখার বিষয়েও পোস্ট করেছিলেন।
শুধু প্রেমের চলচ্চিত্র নয়, ২০১২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকদের উপযোগী ‘আর-রেটেড’ কমেডি চলচ্চিত্র ‘দ্য ডিক্টেটর’ নিয়েও তার পুরোনো একটি পোস্ট রয়েছে। ওই পোস্টে চলচ্চিত্রটির পোস্টার প্রকাশের পাশাপাশি তিনি ছবিটিকে ভালো সিনেমা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
পুরোনো এসব পোস্ট সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের একটি অংশ তার অবস্থানের সঙ্গে ব্যক্তিগত বিনোদন পছন্দের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের বক্তব্য, কোনো ব্যক্তি নিজে বিভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্র উপভোগ করতেই পারেন; কিন্তু একই সময়ে দেশের নাটক ও চলচ্চিত্রে নির্দিষ্ট ধরনের গল্প নির্মাণ বন্ধের দাবি জানালে সেই অবস্থানের যুক্তি ও সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আবার অন্য একটি অংশ মনে করছে, ব্যক্তিগতভাবে কোনো চলচ্চিত্র দেখা এবং সেই ধরনের গল্পকে সামাজিকভাবে উৎসাহিত করার পক্ষে অবস্থান নেওয়া—দুটি বিষয়কে এক করে দেখা ঠিক নয়।
এদিকে আইনি নোটিশে সংবিধানের কয়েকটি অনুচ্ছেদের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। নোটিশে বলা হয়েছে, সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য এবং ২৩ অনুচ্ছেদে জাতীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও বিকাশের বিষয়ে নাগরিকদের দায়িত্বের কথা রয়েছে। পাশাপাশি ৩৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধের সুযোগ রয়েছে বলেও যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।
নোটিশের প্রাপক হিসেবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, তথ্য ও সম্প্রচার সচিব, সংস্কৃতিবিষয়ক সচিব এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের চেয়ারম্যানকে রাখা হয়েছে। নোটিশে অভিযোগ করা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে নাটক ও চলচ্চিত্রে পরকীয়া এবং বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে এমন কিছু গল্প নির্মিত হচ্ছে, যা পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে এসব বিষয় তরুণ ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও স্বাভাবিক সামাজিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
এর পরিবর্তে বিজ্ঞান, শিক্ষা, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও প্রতিরক্ষাসহ জ্ঞানভিত্তিক এবং মানসম্মত বিষয়কে কেন্দ্র করে আরও বেশি নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণের আহ্বান জানানো হয়েছে। নোটিশে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলা হয়েছে, তা না হলে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করা হতে পারে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পুরোনো চলচ্চিত্র-সংক্রান্ত পোস্ট নিয়ে আইনজীবী মাহমুদুল হাসান মামুনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা বা আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ফলে তার আইনি নোটিশের দাবির পাশাপাশি ব্যক্তিগত চলচ্চিত্র পছন্দের বিষয়টিও আপাতত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিতর্কের অংশ হয়ে রয়েছে।









