রাজশাহী নগরের মেহেরচণ্ডী উত্তরপাড়া এলাকায় নেশার জন্য টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে মা ও ছোট ভাইকে ধারালো বঁটি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করার অভিযোগ উঠেছে মেহেদী হাসান ওরফে মুন্না নামের ৩৪ বছর বয়সী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁকে আটক করে মারধর করেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও আহত মা-ছেলেকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে।
শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে চন্দ্রিমা থানার মেহেরচণ্ডী উত্তরপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর আহত পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় মামলা করা হলে পুলিশ মেহেদী হাসানকে গ্রেপ্তার দেখায়। একই সঙ্গে হামলায় ব্যবহৃত ধারালো বঁটিটিও জব্দ করা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মেহেদী দীর্ঘদিন ধরে মাদকসেবনে জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে। ঘটনার রাতে তিনি নেশা করার জন্য পরিবারের কাছে টাকা দাবি করেন। পরিবারের সদস্যরা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁদের সঙ্গে তাঁর কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে মেহেদী রান্নাঘর থেকে একটি ধারালো বঁটি নিয়ে তাঁর মা মোসা. মনোয়ারা খাতুন (৫৫) এবং ছোট ভাই মো. মৃদুলের (২৮) ওপর হামলা করেন বলে অভিযোগ।
হামলায় মা ও ছেলে দুজনই গুরুতর আহত হন। তাঁদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত লাগে। আহতদের চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা মেহেদীকে আটক করেন এবং উত্তেজিত হয়ে তাঁকে মারধর করেন। খবর পেয়ে চন্দ্রিমা থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।
পুলিশ আহত মনোয়ারা খাতুন ও মৃদুলের পাশাপাশি মেহেদীকেও উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। রাত সাড়ে ১২টার দিকে তাঁদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মেহেদী ও মৃদুলকে হাসপাতালের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে এবং মনোয়ারা খাতুনকে ২ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকেরা তাঁদের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন।
ঘটনার পর আহত মনোয়ারা খাতুনের মেয়ে বাদী হয়ে চন্দ্রিমা থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় মেহেদীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, চিকিৎসা শেষে তাঁর শারীরিক অবস্থা আদালতে নেওয়ার মতো হলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মামলার তদন্তের পাশাপাশি হামলার প্রকৃত কারণও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে নেশার টাকা চাওয়ার বিষয়টি হামলার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। তবে এর সঙ্গে পারিবারিক কোনো বিরোধ বা অন্য কোনো ঘটনা যুক্ত ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। হামলার আগে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কী ধরনের কথাবার্তা হয়েছিল, কীভাবে মেহেদীর হাতে বঁটিটি আসে এবং ঘটনার সময় সেখানে অন্য কেউ উপস্থিত ছিলেন কি না—এসব বিষয়ও তদন্তে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও উপকমিশনার (মিডিয়া) মো. গাজিউর রহমান জানিয়েছেন, খবর পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আহত তিনজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠিয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে করা মামলার ভিত্তিতে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি হামলায় ব্যবহৃত বঁটিও জব্দ করা হয়েছে।
এদিকে ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহত ব্যক্তিদের মৃত্যু হয়েছে বলে কিছু পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তবে পুলিশ জানিয়েছে, ওই ঘটনায় কেউ মারা যাননি। মা ও তাঁর দুই ছেলে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যাচাই ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য প্রচার বা শেয়ার না করার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে কোনো দুর্ঘটনা, অপরাধ বা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের বিষয়ে অসমর্থিত মৃত্যুসংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
ঘটনাটি আবারও মাদক ব্যবহারের সঙ্গে পারিবারিক সহিংসতার সম্ভাব্য যোগসূত্রের বিষয়টি সামনে এনেছে। নেশার অর্থ জোগাড়কে কেন্দ্র করে পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগ থাকায় তদন্তে মাদক ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা, হামলার পূর্ণাঙ্গ পরিস্থিতি এবং ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
এখন আহত মা ও দুই ছেলের চিকিৎসা, পরিবারের নিরাপত্তা এবং মামলার তদন্ত—তিনটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তদন্ত শেষে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব তথ্য আরও স্পষ্ট হবে।









