নোয়াখালীর বহুল আলোচিত স্কুলছাত্রী তাসনিয়া হোসেন অদিতা (১৪) হত্যা মামলার রায় ঘোষণার তারিখ আবারও পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। আদালত নতুন করে আগামী ২৯ এপ্রিল রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে প্রতীক্ষিত এই রায় ঘিরে ভুক্তভোগী পরিবার, স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে যেমন গভীর প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তেমনি নতুন তারিখ ঘোষণার ফলে আবারও তৈরি হয়েছে উৎকণ্ঠা ও অপেক্ষার পরিবেশ।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) বেলা ১১টার দিকে নোয়াখালী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মোহাম্মদ খোরশেদুল আলম শিকদার এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। পূর্বনির্ধারিত তারিখে রায় ঘোষণার কথা থাকলেও বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয় বিবেচনায় তা পরিবর্তন করা হয় বলে আদালত সূত্রে জানা যায়। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জানান, মামলার সব দিক পর্যালোচনার জন্য অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হওয়ায় নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
নিহত অদিতা নোয়াখালী পৌরসভার লক্ষ্মীনারায়ণপুর এলাকার মৃত রিয়াজ হোসেন সরকারের কন্যা। তার মা রাজিয়া সুলতানা বেগমগঞ্জ উপজেলার একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সী এই কিশোরীর নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটনার পর থেকেই পুরো এলাকায় তীব্র শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বিকেলে লক্ষ্মীনারায়ণপুর এলাকার জাহান মঞ্জিল থেকে অদিতার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের গলা, হাত ও পায়ের রগ কাটা অবস্থায় পাওয়া যায়, যা স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ঘটনার পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে সাবেক গৃহশিক্ষক আব্দুর রহিম রনিকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে তার দেওয়া তথ্যমতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি, বালিশসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যার দায় স্বীকার করেন এবং আদালতে স্বেচ্ছায় জবানবন্দিও দেন।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, অদিতা পূর্বে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছে প্রাইভেট পড়ত। পরবর্তীতে অন্য শিক্ষকের কাছে পড়াশোনা শুরু করলে অভিযুক্ত ব্যক্তি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। ঘটনার দিন অদিতার মা বাসার বাইরে থাকাকালে তিনি বাসায় প্রবেশ করে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। পরে ঘটনাটি আড়াল করার চেষ্টা হিসেবে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করা হয় বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় এ পর্যন্ত রাষ্ট্রপক্ষের ৪১ জন সাক্ষী এবং আসামিপক্ষের ৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। মামলাটি বহু বছর ধরে চলমান থাকায় রায় ঘোষণার অপেক্ষায় থাকা পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ দুই-ই দেখা দিয়েছে।
ঘটনাক্রম সংক্ষেপে নিচে উপস্থাপন করা হলো—
| তারিখ | ঘটনা |
|---|---|
| ২০২২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর | অদিতার মরদেহ উদ্ধার |
| ২০২২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর রাত | অভিযুক্তের গ্রেপ্তার |
| তদন্ত পর্যায় | আলামত উদ্ধার ও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি |
| বিচারিক পর্যায় | রাষ্ট্রপক্ষের ৪১ ও আসামিপক্ষের ৫ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ |
| ২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল | রায় ঘোষণার তারিখ পুনর্নির্ধারণ |
| ২০২৬ সালের ২৯ এপ্রিল | নতুন রায় ঘোষণার দিন নির্ধারিত |
নিহতের মা রাজিয়া সুলতানা বলেন, তার মেয়ের হত্যার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই এখন একমাত্র প্রত্যাশা। তিনি বলেন, এমন শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের নির্মম অপরাধ করার সাহস না পায়।
এদিকে ঘটনার পর থেকেই নোয়াখালীসহ আশপাশের এলাকায় সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে। মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দ্রুত বিচার নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়। রায় ঘোষণার নতুন তারিখ সামনে আসায় আবারও পুরো এলাকায় উত্তেজনা ও প্রত্যাশার আবহ তৈরি হয়েছে।
