রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নিজ শয়নকক্ষে চাঞ্চল্যকর মো. ফারুক শেখ (৪৫) হত্যার মর্মান্তিক ও নির্মম রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। সঞ্চয়পত্রের ৮ লাখ টাকার লোভে ছোট ভাই আব্দুল বারেক শেখের প্রত্যক্ষ নকশায় এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে নিহতের ছোট ভাইসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রাজবাড়ী আদালতে হাজির করা হলে তারা বিচারকের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
নিহত ফারুক শেখ গোয়ালন্দ পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের পৌরজামতলা এলাকার বাসিন্দা মো. আব্দুল খালেক শেখের বড় ছেলে। গত শনিবার দুপুরে নিজ ঘরে ঘুমন্ত অবস্থায় তিনি নৃশংসতার শিকার হন। ঘাতকরা শুধু তাঁর গলা কেটেই ক্ষান্ত হয়নি, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে দুই হাত কনুই থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এ ঘটনায় গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন—নিহতের ছোট ভাই মো. আব্দুল বারেক শেখ, দৌলতদিয়া ইউনিয়নের হোসেন মণ্ডলপাড়ার মো. রুবেল শেখ (৩০) এবং মো. আলমগীর হোসেন আলম (২৬)।
পরিবার ও পুলিশ সূত্রের তথ্য মতে, জমি বিক্রির আট লাখ টাকা দিয়ে সোনালী ব্যাংকে একটি সঞ্চয়পত্র কিনে জমা রেখেছিলেন ফারুক শেখ। শুরুতে ওই সঞ্চয়পত্রের নমিনি করা হয়েছিল তাঁদের মাতাকে। তবে দুই বছর আগে মা মারা যাওয়ার পর ফারুক নিজের ছোট ভাই বারেককে নমিনি হিসেবে মনোনীত করেন। বাহ্যিকভাবে ভাইদের মধ্যে কোনো দৃশ্যমান কোন্দল না থাকলেও, নমিনি হওয়ার পর থেকেই সেই টাকার ওপর লোভ জন্মায় বারেকের।
হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে পুলিশ পরিবারের বিভিন্ন সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। এ সময় বারেক শেখের জবানবন্দি ও কথাবার্তায় নানা অসঙ্গতি ধরা পড়ে। পরবর্তীতে তাঁকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি নিজের আপন ভাইকে খুনের পুরো পরিকল্পনা ও সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন।
গোয়ালন্দ ঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম জানান, নিহত ফারুক শেখ দৌলতদিয়া পূর্বপাড়ায় তাঁর মামার একটি চায়ের দোকানে দেখাশোনার কাজ করতেন। সেখানে রুবেল ও আলম নামের আরও দুজন কর্মচারী ছিলেন। প্রায় দেড় মাস আগে কোনো এক বিষয় নিয়ে ফারুকের সঙ্গে রুবেল ও আলমের বাকবিতণ্ডা হয়। পরবর্তীতে ফারুকের হস্তক্ষেপে তাঁদের কাজ থেকে বের করে দেওয়া হলে ফারুকের ওপর তাঁদের তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে টাকার লোভে থাকা বারেক নিজের উদ্দেশ্য হাসিলে ওই দুই ক্ষুব্ধ যুবককে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করেন।
চলতি আগস্ট মাসের প্রথম দিকে বারেক শেখ রুবেল ও আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফারুককে হত্যার বিনিময়ে চুক্তির প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ পেয়ে তারা তা বাস্তবায়নে রাজি হয়। ছয়-সাত দিন আগেও তারা একবার ফারুককে হত্যার উদ্দেশ্যে বাড়িতে ঢুকেছিল, কিন্তু ফারুক টের পেয়ে তাঁদের পিটিয়ে তাড়িয়ে দেন।
পরবর্তীতে শুক্রবার বারেক ওই দুজনের সঙ্গে দেখা করে শনিবারেই কাজ শেষ করার চূড়ান্ত পরিকল্পনা আঁকেন। কাজের অগ্রিম বা বায়না হিসেবে তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ১,৭০০ টাকা। ছক অনুযায়ী শনিবার দুপুর ১২টার দিকে রুবেল ও আলম সোজা বারেকদের বাড়িতে উপস্থিত হন। বারেক তাঁদের হাতে দুটি ডাব কাটার সোল তুলে দিয়ে নিজে ঘরের বাইরে চলে যান। ওই সময় ঘরের দরজা খোলা রেখে শান্তিতে ঘুমাচ্ছিলেন ফারুক। ঘুমন্ত অবস্থায় দুই আততায়ী ঘরে ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে প্রথমে তাঁর গলা কেটে হত্যা নিশ্চিত করে। এরপর নৃশংসভাবে দুই হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে সেখান থেকে কেটে পড়ে। কাজ শেষে বারেক তাঁদের সঙ্গে বাইরে দেখা করে আরও ১,৩০০ টাকা দিয়ে দ্রুত এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেন।
রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. শামসুল হক এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, শনিবার রাতেই নিহত ফারুকের বাবা আব্দুল খালেক শেখ বাদী হয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা দুটি দা, মাস্ক, আসামিদের ব্যবহৃত পরিধেয় জামাকাপড় ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করে। আসামিরা আদালতে সম্পূর্ণ সত্যি ঘটনা তুলে ধরে জবানবন্দি দিয়েছেন এবং তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।









