জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

হাওরে বজ্রপাতের ঝুঁকি, বাড়ছে প্রাণহানির শঙ্কা

বর্ষা মৌসুম এলেই নেত্রকোনার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে নতুন করে ফিরে আসে বজ্রপাতের আতঙ্ক। আকাশে কালো মেঘ জমতে শুরু করলেই উৎকণ্ঠায় পড়েন কৃষক, জেলে, দিনমজুর ও খোলা মাঠে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষ। জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিন হাওর, বিল, খোলা মাঠ কিংবা জলাভূমিতে কাজ করতে গিয়ে তাদের অনেককেই জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়। ফলে প্রতিবছরই বজ্রপাতের ঘটনায় এই জেলায় প্রাণহানির সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নেত্রকোনায় বজ্রপাতে অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২১ সালের শুরু থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে বজ্রাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৬০ জন। নিহতদের বড় অংশই কৃষিকাজ, মাছ ধরা কিংবা অন্যান্য শ্রমনির্ভর পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তন, খোলা প্রান্তরে দীর্ঘ সময় অবস্থান এবং নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বর্ষাকালে বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ডুবে থাকে। তখন কৃষক ও জেলেদের অধিকাংশ সময় উন্মুক্ত পরিবেশে কাজ করতে হয়। বজ্রমেঘ তৈরি হওয়ার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বজ্রপাত শুরু হলে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই থাকে না। ফলে প্রাণহানির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

বজ্রপাতে প্রাণহানির পরিসংখ্যান

বছরমৃত্যুর সংখ্যা
২০২১১৫
২০২২
২০২৩১২
২০২৪
২০২৫১২
২০২৬ (জুন পর্যন্ত)১৩
মোট (২০২১–২০২৬ জুন)৬০
সর্বোচ্চ মৃত্যু২০২১ সালে ১৫ জন
সর্বনিম্ন মৃত্যু২০২২ সালে ৩ জন
উচ্চ ঝুঁকির উপজেলাখালিয়াজুরী, মদন, মোহনগঞ্জ, কেন্দুয়া, পূর্বধলা ও সদর

সম্প্রতি কয়েকটি মর্মান্তিক ঘটনা আবারও এই ঝুঁকির ভয়াবহতা সামনে নিয়ে এসেছে। গত ১৮ জুন ভোরে বৃষ্টির পর মদন উপজেলার জয়পাশা গ্রামের ইটভাটা শ্রমিক রাজিব মিয়া (২৪) বাড়ির পাশের জমিতে মাছ ধরতে যান। পরিবারের জন্য মাছ নিয়ে ফেরার আশায় বের হলেও হঠাৎ বজ্রপাতের আঘাতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

একই দিনে কেন্দুয়া উপজেলার মোড়াইল বিলে মাছ ধরার সময় বজ্রপাতে প্রাণ হারান শামসুল হুদা (৫৫)। একই উপজেলার সান্দিকোনা এলাকায় বজ্রাঘাতে নিহত হন আশরাফুল ইসলাম (২৫)। মাত্র একদিনে তিনজনের মৃত্যুর ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। নিহতদের অনেকেই পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় তাদের স্বজনরা আর্থিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতাও একই চিত্র তুলে ধরে। খালিয়াজুরীর মেন্দিপুর গ্রামের কৃষক সামছুল হক জানান, মাঠে কাজ করার সময় অনেক ক্ষেত্রে হঠাৎ করেই আকাশ কালো হয়ে আসে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বজ্রপাত শুরু হয়। আশপাশে নিরাপদ আশ্রয় না থাকায় কাজ ফেলে কোথাও যাওয়ার সুযোগ থাকে না। একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় জেলেরাও। তাদের ভাষ্য, হাওরের মাঝখানে নৌকায় মাছ ধরার সময় বজ্রপাত শুরু হলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাতের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নেত্রকোনা কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ইনচার্জ মো. মামুন বলেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বায়ুমণ্ডলে অস্থিতিশীলতা তৈরি হচ্ছে, যা বজ্রমেঘ গঠনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করছে। সাধারণত কিউমুলোনিম্বাস বা সিবি মেঘ থেকেই বজ্রপাতের উৎপত্তি হয়। তিনি জানান, নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে প্রাকৃতিক সুরক্ষাব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই হাওরাঞ্চলে তালগাছসহ উপযোগী উঁচু গাছ লাগানোর উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন, যা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।

জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান জানিয়েছেন, হাওরের বিশাল বিস্তৃত এলাকায় শুধু বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করে পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বাস্তবসম্মত নয়। এ কারণে কৃষক ও জেলেদের জন্য খোলা মাঠ ও হাওরের কাছাকাছি বিশেষ নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র বা শেল্টার জোন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আকস্মিক বজ্রঝড়ের সময় এসব আশ্রয়কেন্দ্রে দ্রুত আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ থাকবে। ইতোমধ্যে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। স্থান নির্বাচন ও কারিগরি বিষয় মূল্যায়নের জন্য বিশেষজ্ঞ দল সরেজমিন পরিদর্শন করবে। পরিকল্পিত আশ্রয়কেন্দ্রে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা, জরুরি নিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং প্রয়োজনীয় সেবার ব্যবস্থাও রাখা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বজ্রপাতে প্রাণহানি কমাতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সময়মতো আবহাওয়ার আগাম সতর্কবার্তা প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া, কৃষক ও জেলেদের সচেতনতা বৃদ্ধি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা এবং পরিবেশবান্ধব বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি জোরদার করা গেলে প্রাণহানির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। বিশেষ করে নেত্রকোনার মতো উন্মুক্ত হাওরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষায় এসব উদ্যোগ এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর