খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ই জুলাই ২০২৬, ৩:৪৩ পিএম

টানা ভারী বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা ঢল এবং পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের কারণে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য বলছে, সাতটি জেলায় এখনো এক লাখ ৫৫ হাজার ৩১১টি পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। এই দুর্যোগে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১ জনে। একই সঙ্গে বন্যা ও পাহাড়ধসে এখন পর্যন্ত ৫৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং আহত হয়েছেন অন্তত ৩৯ জন।
সোমবার (১৩ জুলাই) প্রকাশিত মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ—এই সাতটি জেলায় বন্যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে। এসব জেলার মোট ৫৯টি উপজেলা, ৩৩৪টি ইউনিয়ন এবং ১২টি পৌরসভা বন্যার পানিতে আক্রান্ত হয়েছে। অনেক এলাকায় বসতবাড়ি, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। পানিবন্দি পরিবারগুলোর বড় একটি অংশ নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে, আবার অনেকে নিজ বাড়িতেই সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
জেলাভিত্তিক প্রাণহানির তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে কক্সবাজার জেলায়। সেখানে প্রাণ হারিয়েছেন ৩১ জন। চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ছয়জন, রাঙামাটিতে তিনজন এবং মৌলভীবাজারে একজনের মৃত্যু হয়েছে। আহতদের সংখ্যাতেও কক্সবাজার শীর্ষে রয়েছে। জেলাটিতে আহত হয়েছেন ২৪ জন। চট্টগ্রামে ১২ জন, বান্দরবানে দুজন এবং খাগড়াছড়িতে একজন আহত হয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, পাহাড়ধস, আকস্মিক ঢল এবং প্রবল স্রোতের কারণে প্রাণহানির ঘটনা বেশি ঘটেছে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন জেলায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করেছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় এক হাজার ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু রয়েছে। এসব কেন্দ্রে ইতোমধ্যে ৩৮ হাজার ৪২২ জন আশ্রয় নিয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থা যৌথভাবে উদ্ধার, খাদ্য সহায়তা ও জরুরি সেবা পৌঁছে দিতে কাজ করছে। দুর্গত এলাকায় শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্যার তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ে। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে ডায়রিয়া, পানিবাহিত সংক্রমণ, চর্মরোগ এবং সাপের কামড়ের মতো ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। এ কারণে স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখা এবং দুর্গত মানুষের কাছে দ্রুত চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। বন্যাকবলিত ১১ জেলায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি উপজেলায় মেডিক্যাল টিম মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে জরুরি চিকিৎসাসেবা, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম দ্রুত পরিচালনা করা যায়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানিয়েছেন, বন্যা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্যালাইন, অ্যান্টিভেনম, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের উপকরণ এবং অন্যান্য জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী দ্রুত দুর্গত এলাকায় পাঠানো হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, কুমিল্লা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিটি জেলার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক তদারকির জন্য একজন করে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে নিচু এলাকার বাসিন্দাদের আরও সতর্ক থাকতে হবে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি, পাহাড়ধসের আশঙ্কা এবং জলাবদ্ধতার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের প্রয়োজন হলে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ত্রাণ, উদ্ধার ও স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা যায়।
মন্তব্য