খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই জুলাই ২০২৬, ১০:৩০ পিএম

ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার কাছে ৩-২ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে মিসর। এই নাটকীয় হারের পর মাঠের রেফারিং এবং ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআরের (VAR) সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে উত্তর আফ্রিকার দলটি। মিসরের প্রধান কোচ হোসাম হাসান ম্যাচ শেষে অভিযোগের আঙুল তুলে বলেছেন, ম্যাচের অতি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে রেফারি ও ভিএআর রেফারি পক্ষাপাতমূলক আচরণ করেছেন। এমনকি লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টিনাকে টুর্নামেন্টে টিকিয়ে রাখার বিশ্ব ফুটবলের এক অদৃশ্য তাড়না থেকেই এই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
তবে এই হাইভোল্টেজ ম্যাচের বিতর্কিত ঘটনাগুলো ভিন্ন চোখে দেখছেন ইংল্যান্ডের সাবেক প্রিমিয়ার লিগ রেফারি অ্যান্ডি ডেভিস। ফুটবল আইনের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে তিনি জানিয়েছেন, ম্যাচে মাঠের রেফারি যে দুটি প্রধান ও ভাগ্যনির্ধারক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা ফুটবলের অফিশিয়াল নিয়ম অনুযায়ী শতভাগ সঠিক ছিল। কোনো দল বা ব্যক্তির স্বার্থে নয়, রেফারিরা স্রেফ আইনের বই মেনেই খেলা পরিচালনা করেছেন।
ম্যাচের দ্বিতীয় হাফের ৬২তম মিনিটে মোস্তফা জিকোর দুর্দান্ত এক গোলে মিশর ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়ে জয়ের সুবাস পাচ্ছিল। কিন্তু ঠিক তখনই নাটকের শুরু হয় এবং ভিএআরের হস্তক্ষেপে গোলটি বাতিল হয়ে যায়। ভিডিও রিপ্লেতে স্পষ্ট দেখা যায়, এই গোলের আক্রমণটি তৈরি হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে মিশরের ডিফেন্ডার মারওয়ান আত্তিয়া আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের খেলোয়াড় লিসান্দ্রো মার্তিনেজের জার্সি টেনে ধরেন এবং তার পায়ের ওপর পা দিয়ে আঘাত করেন। এরপর ভিএআর কক্ষে থাকা রেফারিরা মূল রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়েকে মাঠের পাশের মনিটরে গিয়ে ঘটনাটি আরেকবার দেখার বা ‘অন-ফিল্ড রিভিউ’ করার পরামর্শ দেন। ভিডিওটি বেশ কয়েকবার মনোযোগ দিয়ে দেখে রেফারি গোলটি বাতিলের চূড়ান্ত বাঁশি বাজান।
সাবেক প্রিমিয়ার লিগ রেফারি অ্যান্ডি ডেভিস এই গোল বাতিলের সিদ্ধান্তের পূর্ণ সমর্থন করেছেন। তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, আত্তিয়ার ফাউলটির কারণেই আর্জেন্টিনা মূলত বলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল এবং সেই পাল্টা আক্রমণ থেকেই মিশর গোলটি করতে সক্ষম হয়। ফুটবলের আন্তর্জাতিক নিয়ম বা ‘লজ অব দ্য গেম’ অনুযায়ী, একই আক্রমণপর্বের (অ্যাটাকিং ফেজ অব প্লে) মধ্যে কোনো ফাউল হলে এবং সেই ফাউলের সুযোগ নিয়ে গোল করা হলে তা সরাসরি বাতিলযোগ্য। তাই ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ের সামনে গোলটি বাতিল করা ছাড়া আসলে অন্য কোনো আইনি বিকল্প ছিল না।
আর্জেন্টিনা ম্যাচে ঘুরে দাঁড়িয়ে স্কোরলাইন ২-২ করার পর, একদম শেষ দিকে তাদের জয়সূচক গোলটির আগে পেনাল্টির জোরালো দাবি তোলে মিশর। মাঠে পরপর দুটি ঘটনায় তারা পেনাল্টি দাবি করে। প্রথম ঘটনায় আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের বিরুদ্ধে মিশরের হামদি ফাতির জার্সি টেনে ধরার অভিযোগ ওঠে। এর ঠিক পরেই মিশরের সেরা তারকা মোহাম্মদ সালাহ দাবি করেন, তিনি যখন বল নিয়ে আর্জেন্টিনার পেনাল্টি বক্সে ঢুকছিলেন, তখন হুলিয়ান আলভারেস তাকে পেছন থেকে ফাউল করে ফেলে দিয়েছেন। তবে এই দুই ক্ষেত্রেই মাঠের রেফারি খেলা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন এবং ভিএআর থেকেও রেফারির সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়।
এই সিদ্ধান্তগুলো নিয়েও অ্যান্ডি ডেভিস রেফারির পক্ষেই কথা বলেছেন। তাঁর মতে, ম্যাক অ্যালিস্টারের সামান্য জার্সি টানার ঘটনাটি ফাতির স্বাভাবিক খেলায় বা বলের নিয়ন্ত্রণে কোনো বড় ধরনের প্রভাব ফেলেনি। আধুনিক ফুটবলে পেনাল্টি বক্সের ভেতর এমন ছোটখাটো কাড়াকাড়ি সবসময় পেনাল্টি দেওয়ার মতো গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় না। অন্যদিকে, মোহাম্মদ সালাহর পেনাল্টি দাবির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেখানে আলভারেসের পক্ষ থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কোনো ফাউল ছিল না। দুই খেলোয়াড়ের স্বাভাবিক দৌড়ের গতির কারণে তাদের বুটের মধ্যে সামান্য স্পর্শ বা কন্টাক্ট হয়েছিল, যা ফুটবলের পরিভাষায় ‘রানিং কন্টাক্ট’ এবং এটি ফাউল নয়।
সাবেক এই অভিজ্ঞ রেফারি আরও মনে করিয়ে দেন যে, মিসরের বাতিল হওয়া গোল আর সালাহর পেনাল্টি না পাওয়ার ঘটনা দুটিকে এক পাল্লায় মাপা যাবে না। প্রথম ঘটনাটি ছিল পরিষ্কার এবং সরাসরি একটি ফাউল, যা খেলার গতিকে বদলে দেয়। আর দ্বিতীয় ঘটনাটি ছিল ফুটবল ম্যাচের স্বাভাবিক শারীরিক সংস্পর্শের অংশ। ফলে ডাগআউটে বসে মিসরীয় কোচ হোসাম হাসান যতই ক্ষোভ ঝাড়ুন না কেন, মাঠের রেফারি আইন ও নিয়মের ভেতরে থেকেই সমস্ত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।
মন্তব্য