খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ই জুন ২০২৬, ৪:৫৪ পিএম

বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা জোরদারে ১১০ কোটি মার্কিন ডলারের জরুরি সহায়তা অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক। বৃহস্পতিবার (২৬ জুন) সংস্থাটি এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক সার ও জ্বালানি বাজারে যে মূল্য ও সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব মোকাবিলায় এই অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সার, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এর ফলে আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র কৃষক, নিম্নআয়ের পরিবার এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের খাদ্য উৎপাদন, জরুরি সেবা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দ্রুত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য, সার ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে ক্ষুদ্র কৃষক এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে তাৎক্ষণিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
মোট অর্থায়নের মধ্যে ৩০ কোটি ডলার ব্যয় করা হবে ইমার্জেন্সি সাপোর্ট ফর ফুড সিকিউরিটি বা খাদ্য নিরাপত্তায় জরুরি সহায়তা প্রকল্পে। এই প্রকল্পের আওতায় চলতি বছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আমন মৌসুম এবং অক্টোবর ২০২৬ থেকে এপ্রিল ২০২৭ পর্যন্ত বোরো মৌসুমের জন্য প্রয়োজনীয় সার আমদানিতে অর্থায়ন করা হবে।
বাংলাদেশে বর্তমানে মোট সারের চাহিদার ৮৫ শতাংশেরও বেশি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৬ লাখ মেট্রিক টন সার আমদানি করা হবে, যার অর্ধেকই হবে ইউরিয়া। সরকারের আশা, এই সার ব্যবহার করে প্রায় ১৪ লাখ হেক্টর জমিতে ধান চাষে প্রয়োজনীয় সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন এবং খাদ্য উৎপাদনে সম্ভাব্য সংকট অনেকটাই এড়ানো যাবে।
বিশ্বব্যাংকের লিড ইকোনমিস্ট ও প্রকল্পটির টাস্ক টিম লিডার সোলেমান কুলিবালি বলেন, বাংলাদেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে আমন ও বোরো মৌসুম থেকে। একই সঙ্গে দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে সারের সরবরাহ ব্যাহত হলে শুধু খাদ্যনিরাপত্তাই নয়, কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং দারিদ্র্য পরিস্থিতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে কনটিনজেন্ট ইমার্জেন্সি রেসপন্স (CER) কর্মসূচির আওতায় ৭১ কোটি ৩০ লাখ ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই অর্থ ব্যবহার করা হবে জরুরি পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে নগদ সহায়তা দেওয়া, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পুনরুদ্ধারে সহায়তা এবং জীবিকা পুনর্বাসনের কাজে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় স্থিতিশীল রাখতেও এ তহবিল ব্যবহার করা হবে।
এ ছাড়া জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে এই অর্থের একটি অংশ ব্যয় করা হবে। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ, খাদ্য, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিশুদ্ধ পানি এবং অন্যান্য জরুরি সেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখার উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, প্রকল্পের অর্থ আগামী ৩০ জুনের মধ্যেই ছাড় করা হবে, যাতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম দ্রুত শুরু করা যায়।
বিশ্বব্যাংকের দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও প্রকল্পটির টাস্ক টিম লিডার লেসলি জিন ইউ করদেরো বলেন, চলমান বিভিন্ন প্রকল্পের অব্যবহৃত অর্থ পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে এই জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে নতুন করে দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়ার অপেক্ষা না করে দ্রুত অর্থ ছাড় দেওয়া সম্ভব হবে। এতে বড় ধরনের সংকট দেখা দিলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে দ্রুত সহায়তা দেওয়া, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সচল রাখা এবং কর্মসংস্থানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কৃষি উৎপাদন সচল রাখা, জরুরি সেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে দ্রুত সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে এই অর্থায়ন বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মন্তব্য