স্বাধীন বাংলাদেশে নজরুলের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের অধ্যায়

বাঙালি জাতিসত্তা, সাম্য, মানবতা ও দ্রোহচেতনার অন্যতম প্রধান প্রতীক জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতিতে তাঁর অবদান কেবল সৃজনশীলতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাঙালির রাজনৈতিক চেতনা, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক সাম্যের ধারণার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাঁর কবিতা, গান, প্রবন্ধ ও সাহিত্যকর্ম যুগে যুগে বাঙালিকে সংগ্রাম, অধিকারচেতনা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অনুপ্রাণিত করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসেও নজরুলকে ঘিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে, যা জড়িয়ে আছে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান-এর এক ঐতিহাসিক উদ্যোগের সঙ্গে।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়, ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবোধ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামে যে ভূমিকা রেখেছে, স্বাধীন বাংলাদেশে সেই সাংস্কৃতিক ধারাকে মর্যাদার সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন।

এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭২ সালে কবির ৭৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু তাঁকে ঢাকায় আনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সে সময় কবি ভারতের কলকাতায় অবস্থান করছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর তৎকালীন পূর্তমন্ত্রী মতিউর রহমান এবং আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ও সমাজসেবা সম্পাদক মুস্তফা সারওয়ার-কে ব্যক্তিগত প্রতিনিধি হিসেবে কলকাতায় পাঠান।

বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে কবির কাছে একটি আন্তরিক আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়। সেই চিঠিতে স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে কবিকে দেশে আসার আহ্বান জানানো হয়। বঙ্গবন্ধু তাঁর বার্তায় উল্লেখ করেন যে, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের মানুষ কবির আগমনের অপেক্ষায় রয়েছে এবং তাঁর আদর্শে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করতে চায়। চিঠির শেষে তিনি “জয় বাংলা” স্লোগানও উল্লেখ করেন, যা মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালির প্রধান প্রেরণার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুর এই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে ১৯৭২ সালের ২৪ মে কাজী নজরুল ইসলামকে কলকাতা থেকে সসম্মানে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানীতে কবির আগমন দেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। ঢাকায় পৌঁছানোর পর তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে এ বিষয়ে সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

কবি নজরুল ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তৎকালীন সরকার রাজধানীর ধানমন্ডিতে কবির জন্য একটি বাড়ি বরাদ্দ করে। একই সঙ্গে তাঁর চিকিৎসা, দেখভাল এবং জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় দায়িত্ব রাষ্ট্র গ্রহণ করে। সে সময় কবি দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতার কারণে বাকশক্তি হারিয়ে নীরব জীবনযাপন করছিলেন। এরপরও তাঁকে স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক হিসেবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয়।

নজরুলকে বাংলাদেশে নিয়ে আসার এই সিদ্ধান্তকে শুধু একজন কবির পুনর্বাসন হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক ভিত্তি নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত। বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সাম্যের দর্শন এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে নজরুলকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক দর্শনেরও প্রতিফলন ঘটে।

১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট কাজী নজরুল ইসলাম মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশেই অবস্থান করেন এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জীবন অতিবাহিত করেন। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ-এর পাশে সমাহিত করা হয়। তাঁর সমাধিস্থল বর্তমানে সাহিত্যপ্রেমী, সংস্কৃতিকর্মী ও দর্শনার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বিবেচিত।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য, সংগীত ও দর্শন বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর রচিত বিদ্রোহ, সাম্য, মানবতা এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির বাণী বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনার ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

এস এম কামরুজ্জামান সাগর
নির্মাতা, সংগঠক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট।