বিশ্ব অর্থবাজারে মার্কিন মুদ্রার শক্তিশালী অবস্থান আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারের মান দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে গত ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে সংঘাতময় পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ মুদ্রানীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা—এই দুই প্রধান কারণ বিশ্ব বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও বৃদ্ধি পেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার পুনরায় বাড়ানোর পথে যেতে পারে। উচ্চ সুদের হার সাধারণত ডলারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ বাড়ায়, কারণ এটি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও লাভজনক সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।
একই সময়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বিশ্ব তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই রুটটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হওয়ায় এর যেকোনো বিঘ্ন সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে আমদানিনির্ভর দেশগুলো চাপের মুখে পড়ছে।
বিশ্ববাজারে প্রধান মুদ্রাগুলো ডলারের বিপরীতে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইউরো, ব্রিটিশ পাউন্ড, অস্ট্রেলীয় মুদ্রা এবং নিউজিল্যান্ড মুদ্রা—সবই সাম্প্রতিক সময়ে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখিয়েছে। বিশেষ করে জাপানি মুদ্রার অবমূল্যায়ন এতটাই বেড়েছে যে এটি এক ডলারের বিপরীতে প্রায় ১৬০-এর কাছাকাছি অবস্থান করছে, যা অতীতে সরকারি হস্তক্ষেপের সীমা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
নিচে প্রধান মুদ্রা ও জ্বালানির সাম্প্রতিক অবস্থার একটি সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো—
| উপাদান | বর্তমান মান | অবস্থা |
|---|---|---|
| ডলার সূচক | ৯৯.৩০৬ | ছয় সপ্তাহের সর্বোচ্চের কাছাকাছি |
| ইউরো | ১.১৬০৮ ডলার | নিম্নমুখী প্রবণতা |
| ব্রিটিশ পাউন্ড | ১.৩৩৯৮ ডলার | ছয় সপ্তাহের নিম্নস্তরের কাছাকাছি |
| অস্ট্রেলীয় মুদ্রা | ০.৭০৯৭ ডলার | শূন্য দশমিক ১৪ শতাংশ কম |
| নিউজিল্যান্ড মুদ্রা | ০.৫৮২২ ডলার | শূন্য দশমিক ২৪ শতাংশ কম |
| ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেল | ১১০.৮ ডলার প্রতি ব্যারেল | উচ্চমূল্য ও অস্থিরতা |
| জাপানি মুদ্রা | এক ডলারে প্রায় ১৫৯ | অতিরিক্ত দুর্বলতা |
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডের মুনাফার হার ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এটি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিক্রির চাপ বাড়িয়েছে এবং বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী বৈঠকের কার্যবিবরণী নিয়ে বাজারে জল্পনা চলছে, যেখানে ভবিষ্যতে আরও কঠোর মুদ্রানীতির ইঙ্গিত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, জাপানি মুদ্রার দুর্বলতা এতটাই তীব্র হয়েছে যে এক ডলারের বিপরীতে মান ১৬০-এর সীমা অতিক্রমের কাছাকাছি চলে এসেছে। অতীতে এই সীমায় পৌঁছালে জাপান সরকার একাধিকবার বাজারে হস্তক্ষেপ করেছে, ফলে এবারও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপকভাবে পড়তে পারে। জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি পেলে পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং ভোক্তা পর্যায়ের মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যেতে পারে। আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এটি বড় ধরনের চাপ তৈরি করবে। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
