খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ই মে ২০২৬, ১২:১৮ এএম

মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন বাহিনীর হামলার ঘটনায় নিখোঁজ পাঁচজন নাবিকের মধ্যে একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (৭ মে, ২০২৬) রাতে ওই অঞ্চলে শুরু হওয়া সামরিক উত্তেজনা এবং পরবর্তী হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনায় এ প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ওই এলাকায় ব্যাপক উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং ঘটনার শিকার বাকি নাবিকদের সন্ধানে তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে।
Table of Contents
ইরানের মিনাব কাউন্টির গভর্নর মোহাম্মদ রাদমেহের আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় বার্তাসংস্থা মেহের নিউজকে মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান যে, উদ্ধারকারী দলগুলো নিখোঁজ পাঁচজন নাবিকের সন্ধানে সাগরে তল্লাশি চালানোর সময় একজনের মৃতদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, মার্কিন বাহিনীর আক্রমণের পর জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে বেশ কয়েকজন নাবিক নিখোঁজ হন। মিনাব কাউন্টির গভর্নর আরও জানিয়েছেন যে, উদ্ধারকৃত দেহটি ময়নাতদন্ত ও শনাক্তকরণের জন্য পাঠানো হয়েছে। তবে বাকি চারজন নাবিকের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা এখনো অনিশ্চিত।
হামলার পরপরই দেওয়া এক বিবৃতিতে গভর্নর মোহাম্মদ রাদমেহের জানিয়েছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক হামলায় অন্তত ১০ জন ইরানি নাবিক বিভিন্ন মাত্রায় আহত হয়েছেন। আহতদের দ্রুত নিকটবর্তী চিকিৎসা কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছে। ইরানের বার্তাসংস্থা মেহের নিউজের তথ্যমতে, হামলার সময় ইরানের সিরিক নামক এলাকায় শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। ভৌগোলিকভাবে সিরিক এলাকাটি হরমুজ প্রণালির অত্যন্ত সন্নিকটে অবস্থিত হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠে ঘটে যাওয়া বিস্ফোরণের তরঙ্গ উপকূলেও অনুভূত হয়েছে। বিস্ফোরণের মাত্রা এতই প্রবল ছিল যে, স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।
পরবর্তী প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী জানা গেছে যে, সংঘাতের রেশ এখানেই থেমে থাকেনি। শুক্রবার (৮ মে) যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় বিমান হামলা চালিয়েছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, ইরানের কয়েকটি খালি ট্যাংকার জাহাজ নৌ-অবরোধ বা ব্লকড ভাঙার চেষ্টা করছিল। সেই প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করার লক্ষ্যেই যুক্তরাষ্ট্র এই বিমান হামলা পরিচালনা করে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-আরাবিয়া এবং ফক্স নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ইরানের একাধিক খালি তেলের ট্যাংকারকে লক্ষ্যবস্তু করে এই আক্রমণ চালানো হয়। মার্কিন সামরিক সূত্রগুলো দাবি করছে যে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অবরোধ বজায় রাখার স্বার্থে এই পদক্ষেপ অনিবার্য ছিল।
হরমুজ প্রণালি বিশ্ব বাণিজ্যের বিশেষ করে জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত জলপথ। এই অঞ্চলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সরাসরি সংঘাত বিশ্ব বাজারে জ্বালানির দাম এবং আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে। আলজাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই হামলার পর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। ইরান এই হামলাকে তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হিসেবে বর্ণনা করেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এই পদক্ষেপকে তাদের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত অবস্থানের অংশ হিসেবে দাবি করছে।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালি ও পার্শ্ববর্তী সমুদ্রসীমায় উভয় পক্ষের যুদ্ধজাহাজ ও নজরদারি ব্যবস্থার সক্রিয়তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, নিখোঁজ নাবিকদের উদ্ধারে তারা সকল প্রকার কারিগরি ও সামরিক সক্ষমতা নিয়োগ করেছে। তবে নিখোঁজদের জীবিত ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে বলে উদ্ধারকারীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
মিনাব কাউন্টির গভর্নরের নির্দেশনা অনুযায়ী, কোস্টগার্ড এবং নৌবাহিনীর বিশেষ দলগুলো সাগরের নির্দিষ্ট স্থানাঙ্কগুলোতে তল্লাশি চালাচ্ছে। প্রতিকূল আবহাওয়া এবং যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষের কারণে উদ্ধারকাজে কিছুটা ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। তবে ইরান সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, নিখোঁজ সর্বশেষ নাবিকটির সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত এই অভিযান বন্ধ করা হবে না। একই সাথে আহত ১০ জন নাবিকের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এই সামরিক সংঘাতের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণের কাজও শুরু করেছে তেহরান। আন্তর্জাতিক সমুদ্র চলাচল সংস্থা (IMO) এবং অন্যান্য বৈশ্বিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো এই ঘটনার গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
মন্তব্য