চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায় তাসরিন আকতার (২৫) নামে চার মাস বয়সের এক অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার (৮ মে, ২০২৬) দুপুর আনুমানিক ৩টার দিকে হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে পুলিশ ওই গৃহবধূর মরদেহটি উদ্ধার করে। নিহত গৃহবধূ তাসরিন আকতার উপজেলার উত্তর মাদার্শা ইউনিয়নের মাহালুমা বাজার সংলগ্ন ওবাইদুল্লাহ সওদাগর বাড়ির শাহাদাত হোসেনের স্ত্রী। তিনি একাধারে ১৭ মাস বয়সী একটি পুত্র সন্তানের জননী এবং বর্তমানে গর্ভবতী ছিলেন।
Table of Contents
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও মরদেহ উদ্ধার
নিহত তাসরিনের পৈতৃক নিবাস রাউজান উপজেলার গহিরা এলাকার রোজা আলী বাড়িতে। তিনি মুজিবুর রহমান ও রুবি আক্তার দম্পতির কন্যা। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার দুপুরে স্বামীর বাড়িতে অবস্থানকালীন তাসরিন আকতার নিজ কক্ষের সিলিং বা জানালার সাথে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি টের পাওয়ার পর তাকে দ্রুত উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে নিয়ে যান। সেখানে অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে স্থানান্তর করা হয়। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত চিকিৎসক শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতের পরিবারের দাবি ও নির্যাতনের অভিযোগ
তাসরিনের মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর তার বাবার বাড়ির সদস্যরা হাসপাতালে উপস্থিত হন। নিহতের পিতা মুজিবুর রহমান ও মাতা রুবি আক্তারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, বিয়ের পর থেকেই তাসরিনের ওপর শ্বশুরবাড়ির লোকজন মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিল। তাদের দাবি, পারিবারিক কলহ ও ক্রমাগত নির্যাতনের যন্ত্রণা সইতে না পেরে চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা তাসরিন আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর পেছনে প্ররোচনা ও পূর্ববর্তী নির্যাতনের দায়ভার শ্বশুরবাড়ির লোকজনের ওপর বর্তায় বলে তারা উল্লেখ করেন। যদিও শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ
খবর পেয়ে হাটহাজারী মডেল থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছায়। তারা মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করার পর ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল মর্গে প্রেরণের ব্যবস্থা করে। হাটহাজারী মডেল থানার সেকেন্ড অফিসার নাজমুল হাসান শুক্রবার সন্ধ্যায় সংবাদমাধ্যমকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মরদেহের গলায় আঘাতের চিহ্ন প্রাথমিক সুরতহালে পরিলক্ষিত হয়েছে, যা আপাতদৃষ্টিতে আত্মহত্যার আলামত হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। তবে এটি প্রকৃতপক্ষেই আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনো রহস্য নিহিত রয়েছে, তা ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হবে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে যে, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় কেন একজন নারী এমন চরম সিদ্ধান্ত নিলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত করা হবে। বর্তমানে হাটহাজারী মডেল থানায় একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা দায়ের করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং আইনগত সকল আনুষ্ঠানিকতা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে।
সামাজিক প্রভাব ও বর্তমান পরিস্থিতি
হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় এই গৃহবধূর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। ১৭ মাস বয়সী এক অবোধ শিশু ও অনাগত সন্তানসহ একজন মায়ের এমন প্রস্থান স্থানীয় বাসিন্দাদের মর্মাহত করেছে। উত্তর মাদার্শা এলাকার মাহালুমা বাজারে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা না হলেও পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহটি তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, আত্মহত্যার প্ররোচনা বা যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের ফলে মৃত্যু ঘটলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ। তাসরিনের পরিবারের উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে পুলিশ নিহতের স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনতে পারে। বর্তমানে পুরো এলাকা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে, যা এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্তের আশ্বাস প্রদান করা হয়েছে এবং আইনগত প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হচ্ছে।
