শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলায় নিখোঁজ হওয়ার দীর্ঘ ২২ ঘণ্টা পর সানজিদা আক্তার (১০) নামে এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শুক্রবার (৮ মে) বিকেলে উপজেলার রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নের পানিহাতা গ্রামে প্রতিবেশীর বাড়ির টয়লেট থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ অভিযুক্তের বাবা, মা ও বোনসহ মোট তিনজনকে আটক করেছে।
Table of Contents
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও নিখোঁজ সংবাদ
নিহত শিশু সানজিদা আক্তার নালিতাবাড়ী উপজেলার পানিহাতা এলাকার আমিনুল ইসলামের মেয়ে। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সানজিদার মা চার বছর আগে মৃত্যুবরণ করেন। মায়ের মৃত্যুর পর থেকেই শিশুটি তার নানির সঙ্গে উপজেলার চাঁনভানু গ্রামে বসবাস করে আসছিল। গত বুধবার বিকেল থেকে সানজিদা হঠাৎ নিখোঁজ হয়। পরিবারের সদস্যরা সম্ভাব্য সকল স্থানে দীর্ঘক্ষণ খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান লাভে ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে তারা বিষয়টি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, এলাকাবাসী এবং আত্মীয়-স্বজনদের অবহিত করেন।
অভিযুক্তের তথ্য ও মরদেহ উদ্ধার
নিখোঁজের পর স্থানীয়দের মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে যে, সানজিদাকে সর্বশেষ কালাকুমা এলাকার বাসিন্দা চাঁন মিয়া ওরফে চাঁনু পাগলার ছেলে বিল্লাল হোসেনের সঙ্গে দেখা গিয়েছিল। এই তথ্যের ভিত্তিতে সানজিদার খালা সখিনা বেগম অভিযুক্ত বিল্লাল হোসেনের বাড়িতে গিয়ে তার ভাগ্নির বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এ সময় স্থানীয় এলাকাবাসীও সেখানে উপস্থিত হয়ে বিল্লালের বাবা চাঁন মিয়াকে চাপের মুখে ফেলেন।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এবং বিল্লাল হোসেন পলাতক থাকায় তার সঙ্গে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয়। ফোনে কথোপকথনের একপর্যায়ে বিল্লাল স্বীকার করে যে, সে সানজিদাকে হত্যা করে তার নিজের বাড়ির টয়লেটের ভেতরে মরদেহ লুকিয়ে রেখেছে। এই স্বীকারোক্তির পর স্থানীয়রা টয়লেটের ভেতর থেকে শিশুটির নিথর দেহ খুঁজে পান। খবর পেয়ে নালিতাবাড়ী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।
পুলিশের পদক্ষেপ ও আটককৃতদের পরিচয়
এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ তাৎক্ষণিক অভিযান শুরু করে। মূল অভিযুক্ত বিল্লাল হোসেন পলাতক থাকলেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ তার পরিবারের তিন সদস্যকে আটক করেছে। আটককৃতরা হলেন— অভিযুক্ত বিল্লাল হোসেনের বাবা চাঁন মিয়া ওরফে চাঁনু পাগলা, মা তহুরন বেগম এবং বোন রাবেয়া।
নালিতাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফুজ্জামান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান যে, পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, আটককৃত তিনজনকে বর্তমানে থানায় রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ শেষে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয় জনমনে প্রতিক্রিয়া ও বর্তমান অবস্থা
শিশু সানজিদার এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে পানিহাতা এবং চাঁনভানু গ্রামসহ পুরো নালিতাবাড়ী উপজেলায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রতিবেশী এবং এলাকাবাসীরা এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং মূল অভিযুক্ত বিল্লাল হোসেনের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন। পরিবারের অভিযোগ, শিশুটিকে প্রলুব্ধ করে নিয়ে গিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ব্যক্তিগত কোনো আক্রোশ বা অপরাধমূলক উদ্দেশ্যে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে পারে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের পরেই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত মোটিভ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে। বর্তমানে এলাকায় পুলিশি নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং বিল্লাল হোসেনকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এই ঘটনাটি গ্রামীণ জনপদে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। শিশু সানজিদার পরিবার এখন বিচারপ্রার্থী হয়ে প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে আছে। পুলিশের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, তদন্ত প্রক্রিয়ায় কোনো গাফিলতি হবে না এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। অবোধ শিশুর এমন করুণ মৃত্যুতে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযুক্তের পরিবারের অসহযোগিতামূলক আচরণের প্রতিও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তদন্তের স্বার্থে আটককৃত তিনজনের বক্তব্য বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করছে নালিতাবাড়ী থানা পুলিশ।
