খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই ডিসেম্বর ২০২৫, ৫:৪৬ পিএম

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এক গভীর ও বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি। দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত এই খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা শুধু আর্থিক ব্যবস্থার ওপরই নয়, সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে, যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। মাত্র এক বছর আগে, অর্থাৎ গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অর্থনীতিবিদদের মতে একটি অশনিসংকেত।
সব ব্যাংকের অবস্থা এক রকম নয়। সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ২৩টির খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের নিচে রয়েছে, যা তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়ক। তবে বিপরীত চিত্রও ভয়াবহ—১৭টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫০ শতাংশের বেশি এবং ছয়টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এই ছয়টি ব্যাংক কার্যত অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ব্যাংক খাত থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ ঋণের নামে বের করে নেওয়া হয়। এসব অর্থের বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পুনঃতফসিল, বিশেষ সুবিধা ও নীতিগত ছাড় দিয়ে দীর্ঘদিন এসব ঋণ নিয়মিত দেখানো হয়েছিল। কিন্তু সেই সুযোগ বন্ধ হওয়ায় এখন প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে এবং হঠাৎ করেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে।
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো অর্থনীতিবিদ এম. হেলাল আহমেদ জনির মতে, খেলাপি ঋণ বাড়তে দেওয়া কোনো অর্থনীতির জন্যই শুভ নয়। তিনি মনে করেন, ব্যাংক খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে খেলাপি ঋণের প্রবণতা আবারও বাড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও কঠোর ও স্বাধীন তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষভাবে উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে কিছু ইসলামী ও বেসরকারি ব্যাংক। শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর দুরবস্থা কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একীভূতকরণের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রাথমিকভাবে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মন্তব্য