জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

১৯ বছরের পোশাক কারখানা বন্ধ, কর্মহীন ১৯০ জন

রাজধানীর মিরপুরে প্রায় দুই দশক ধরে গড়ে তোলা রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা ‘ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস’ শেষ পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন উদ্যোক্তা মাহবুবুল হাসান ফয়সাল। দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক মন্দা, বিদেশি ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আর্থিক চাপ সামাল দিতে না পারায় গত বৃহস্পতিবার কারখানাটির কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এতে ১৭৭ জন শ্রমিকসহ মোট ১৯০ জন কর্মী কর্মহীন হয়েছেন।

পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠনের সদস্যদের একটি গ্রুপে দেওয়া বার্তায় নিজের দীর্ঘ ব্যবসায়িক পথচলার কথা তুলে ধরে হতাশা প্রকাশ করেন মাহবুবুল হাসান। তিনি জানান, কারখানাটি সচল রাখতে শেষ পর্যন্ত নিজের ব্যক্তিগত সম্পদও ঝুঁকিতে ফেলেছিলেন। কিন্তু ক্রমাগত লোকসান ও নগদ অর্থের সংকট থেকে বের হতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করা ছাড়া আর কোনো পথ তাঁর সামনে খোলা ছিল না।

এখন তাঁর প্রধান লক্ষ্য কারখানাটি বিক্রি করে পাওনাদারদের দেনা পরিশোধ করা। পাশাপাশি নতুন কোনো উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানটি কিনে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনবেন—এমন প্রত্যাশাও রয়েছে তাঁর।

২৬ লাখ টাকা থেকে যাত্রা শুরু

মাহবুবুল হাসানের উদ্যোক্তা জীবনের শুরু ২০০৬ সালে। সে সময় অংশীদারদের সঙ্গে মিলে মিরপুরে ‘ম্যাট্রিক্স স্টাইল’ নামে সাব-কনট্রাক্টিং ব্যবসা শুরু করেন তিনি। তবে অংশীদারদের সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দেওয়ায় সেই উদ্যোগ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

পরে আগের ব্যবসা থেকে সঞ্চয় করা ২৬ লাখ টাকা দিয়ে ২০০৯ সালে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস’ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। শুরুর দিকে অন্যের রপ্তানি লাইসেন্স ব্যবহার করে পোশাক রপ্তানি করতে গিয়ে লোকসানের মুখে পড়েন। এরপর ২০১১ সালে মিরপুরের রূপনগরের একটি ভাড়া শেডে কারখানা স্থানান্তর করেন। একই সময়ে নিজস্ব রপ্তানি লাইসেন্স সংগ্রহ করে সরাসরি বিদেশি ক্রেতাদের জন্য পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানি শুরু করেন।

ছোট পরিসরে শুরু হলেও ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা বিস্তৃত হয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয় এবং নিয়মিত ক্রয়াদেশ পেতে শুরু করে কারখানাটি।

২০২৩ সালে সর্বোচ্চ রপ্তানি

কারখানার ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষিত হওয়ার পর নিরাপত্তাজনিত কারণে ২০২২ সালের শেষ দিকে ‘ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস’ মিরপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেন এলাকার একটি ভাড়া শেডে স্থানান্তর করা হয়। নতুন কারখানায় যাওয়ার পর ব্যবসায়িক কার্যক্রমও কিছুটা গতি পায়।

২০২৩ সাল প্রতিষ্ঠানটির জন্য সবচেয়ে ভালো সময়গুলোর একটি ছিল। ওই বছর প্রায় ৪১ লাখ মার্কিন ডলারের পোশাক রপ্তানি করে প্রতিষ্ঠানটি। দেশীয় মুদ্রায় যার মূল্য ৪৪ কোটি টাকারও বেশি। পোল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন ও অস্ট্রিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের প্রায় ১০ থেকে ১১টি পরিচিত ক্রেতা প্রতিষ্ঠান তখন নিয়মিত কারখানাটি থেকে পোশাক সংগ্রহ করত।

কিন্তু সেই সাফল্য ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী দুই বছরে রপ্তানি আয় দ্রুত কমে যায়।

বিষয়তথ্য
উদ্যোক্তা হওয়ার শুরু২০০৬ সাল
নিজস্ব প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা২০০৯ সাল
প্রাথমিক নিজস্ব পুঁজি২৬ লাখ টাকা
নিজস্ব রপ্তানি লাইসেন্স২০১১ সাল
নতুন কারখানায় স্থানান্তর২০২২ সালের শেষ দিকে
সর্বোচ্চ রপ্তানি২০২৩ সালে
২০২৩ সালের রপ্তানিপ্রায় ৪১ লাখ মার্কিন ডলার
২০২৪ সালের রপ্তানিপ্রায় ২০.৫ লাখ মার্কিন ডলার
২০২৫ সালের রপ্তানিপ্রায় ১৭ লাখ মার্কিন ডলার
ইউরোপীয় ক্রেতাপ্রায় ১০–১১টি
কারখানা বন্ধগত বৃহস্পতিবার
মোট কর্মী১৯০ জন
শ্রমিক১৭৭ জন
বকেয়া ভাড়া৯ মাস

মজুরি বাড়লেও বাড়েনি পোশাকের দাম

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ১২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। উদ্যোক্তার ভাষ্য অনুযায়ী, এতে কারখানার উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। শ্রমিকদের মজুরি ছাড়াও বিদ্যুৎ, ভাড়া, পরিবহন, কাঁচামাল ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় সামাল দেওয়ার চাপ বাড়তে থাকে।

সমস্যা তৈরি হয় অন্য জায়গায়ও। উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পর বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে পোশাকের দাম বাড়ানোর প্রত্যাশা করলেও সেই অনুযায়ী সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে উৎপাদন খরচ এবং বিক্রয়মূল্যের মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বড় হতে থাকে।

এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশের পরিমাণ কমে যায়। পর্যাপ্ত কাজ না থাকায় উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। অথচ কারখানা চালু রাখতে অনেক ব্যয়ই নিয়মিত বহন করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে নগদ অর্থের ওপর চাপ বাড়তে থাকে।

২০২৩ সালে প্রায় ৪১ লাখ মার্কিন ডলারের রপ্তানির পর ২০২৪ সালে তা কমে প্রায় ২০ লাখ ৫০ হাজার ডলারে দাঁড়ায়। ২০২৫ সালে আরও কমে রপ্তানি আয় প্রায় ১৭ লাখ ডলারে নেমে আসে। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় অর্ধেকেরও বেশি কমে যায়।

সাব-কনট্রাক্টিংয়েও কাটেনি লোকসান

বিদেশি ক্রয়াদেশের ঘাটতি পূরণ করতে গত সাত থেকে আট মাস ধরে সাব-কনট্রাক্টিংয়ের কাজ নেওয়ার চেষ্টা করেন উদ্যোক্তা। কিন্তু সেই কাজ থেকেও কারখানার সামগ্রিক পরিচালন ব্যয় উঠে আসেনি।

একপর্যায়ে কারখানার ভবন ভাড়া টানা নয় মাস বকেয়া পড়ে যায়। প্রতিষ্ঠানটি সচল রাখতে মাহবুবুল হাসান নিজের বসতবাড়ির ফ্ল্যাট পর্যন্ত বন্ধক রাখেন। ব্যক্তিগত সম্পদ ঝুঁকিতে ফেলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার এই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।

কারখানা বন্ধের ফলে ১৯০ জন কর্মী সরাসরি কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৭৭ জন শ্রমিক। একটি কারখানা বন্ধ হওয়ার প্রভাব শুধু কর্মীদের মাসিক আয়ের ওপর পড়ে না; তাঁদের পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়, সন্তানদের পড়াশোনা এবং অন্যান্য প্রয়োজনও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।

দেনা শোধ করাই এখন প্রধান লক্ষ্য

প্রায় দুই দশকের শ্রম, বিনিয়োগ ও অভিজ্ঞতার পর ‘ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস’ বন্ধ হয়ে যাওয়াকে নিজের ব্যবসায়িক জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় হিসেবে দেখছেন মাহবুবুল হাসান। শুরুতে মাত্র ২৬ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে যে প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়েছিলেন, একসময় সেটি ইউরোপের একাধিক দেশের ক্রেতাদের কাছে পোশাক রপ্তানি করত। ২০২৩ সালে রপ্তানি ৪১ লাখ মার্কিন ডলারে পৌঁছানো সেই যাত্রার বড় সাফল্যের প্রমাণ।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে ক্রয়াদেশের সংকট এবং উৎপাদন ব্যয়ের চাপ সেই অবস্থান ধরে রাখতে দেয়নি। সাব-কনট্রাক্টিংয়ের মাধ্যমে ব্যবসা সচল রাখার চেষ্টা, ব্যক্তিগত সম্পদ বন্ধক রাখা এবং বকেয়া ভাড়া সামলানোর উদ্যোগও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দিতে পারেনি।

এখন কারখানাটি বিক্রি করে পাওনাদারদের দেনা পরিশোধ করাই তাঁর অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে নতুন কোনো উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানটি কিনে উৎপাদন কার্যক্রম পুনরায় শুরু করলে কর্মীদের একটি অংশের কর্মসংস্থান ফিরতে পারে—এমন আশাও রয়েছে।

‘ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস’-এর বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা একজন উদ্যোক্তার দীর্ঘ ব্যবসায়িক সংগ্রামের সমাপ্তির পাশাপাশি তৈরি পোশাক খাতের কয়েকটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ সামনে এনেছে। বিদেশি ক্রয়াদেশের অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ক্রেতাদের মূল্যসংবেদনশীলতা এবং দীর্ঘ সময় ধরে নগদ অর্থের সংকট—সবকিছু একসঙ্গে সামাল দেওয়া ছোট ও মাঝারি কারখানার জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

১৯ বছর ধরে টিকে থাকা একটি রপ্তানিমুখী কারখানার শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যাওয়া তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাব বন্ধ হওয়ার ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন উদ্যোক্তার দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ও শ্রম, ১৯০টি কর্মসংস্থান এবং বহু পরিবারের জীবিকার প্রশ্ন।

Tags :

SHOWRAV BISHWAS

সর্বশেষ খবর