রংপুরে সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী এবং তার পরিবারের চার সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার লোমহর্ষক বিবরণ দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ। রবিবারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক তদন্ত ও গ্রেপ্তার আসামিদের দেওয়া চাঞ্চল্যকর তথ্য গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন তিনি। কথা বলতে বলতে বেশ কয়েকবার আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন এই শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা।
গত বৃহস্পতিবার রাতের শেষ প্রহরে রংপুরে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইতোমধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন নগরীর মাছুয়াপাড়ার বাসিন্দা মুগ্ধ দাস, যিনি সিটি বাজারের একটি মাছের দোকানে কাজ করেন, এবং তার মামাতো ভাইয়ের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস, যিনি স্থানীয় পিকে জুয়েলার্সে কর্মরত। রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার জানান, শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী অত্যন্ত সম্মানিত এবং শান্ত স্বভাবের একজন মানুষ ছিলেন। তার পরিবারের সঙ্গে স্থানীয় কারো কোনো ধরনের বিবাদ বা শত্রুতা ছিল না। ঘটনার রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ স্থানীয় এক মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ইয়াবা কিনে সীমান্ত নামের একজনের বাসায় সেবন করেন। পরবর্তীতে রাতের শেষভাগে তারা দেবু নামের এক ব্যক্তির নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ হয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে প্রবেশ করেন।
ছাদে বসে মাদক সেবন করার সময় সামান্য শব্দ পেয়ে খালি গায়ে ও গলায় গামছা পেঁচানো অবস্থায় ছাদে চলে আসেন গণপতি চক্রবর্তী। এ সময় ঘাতকরা গামছা দিয়ে গলা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করে। এরপর শব্দ শুনে সিঁড়িতে ছুটে আসেন তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী। তাকেও একইভাবে গামছা পেঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা দিতে গিয়ে পুলিশ কমিশনারের গলার স্বর ভারী হয়ে আসে এবং তিনি চোখ মুছতে শুরু করেন। তিনি জানান, বাবা-মায়ের চিৎকার শুনে তাদের ২৫ বছর বয়সী মেয়ে প্রাপ্তি চক্রবর্তী এগিয়ে এলে ঘাতকরা তাকেও রেহাই দেয়নি। প্রাপ্তিকে হত্যা করতে চার থেকে পাঁচ মিনিট সময় লেগেছিল বলে আসামিরা স্বীকার করেছে। প্রাণ চলে যাওয়ার সেই ধস্তাধস্তির সময় ঘাতকরা রশি দিয়ে তার গলা এবং মুখ এমন জোরে পেঁচিয়ে ধরে যে তার চোয়াল ভেঙে যায় এবং চোখ দুটি ঠিকরে বেরিয়ে আসে।
চার সদস্যের ওই পরিবারের সবচেয়ে ছোট সন্তান, রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির বারো বছর বয়সী ছাত্র প্রিয়ম চক্রবর্তীকে হত্যার বর্ণনা দেওয়ার সময় পুলিশ কমিশনার পুরোপুরি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। নিজ ছেলের বয়সি এই শিশুটির কথা বলতে গিয়ে তিনি কিছুক্ষণ কথা থমকে রাখেন এবং কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ছোট এই শিশুটিকেও একইভাবে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে এবং বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, এত বড় একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘলানোর পর অপরাধীদের আচরণ ছিল অত্যন্ত ঠান্ডা মাথার। পুলিশ কমিশনার জানান, চারজনকে হত্যার পর সকাল হয়ে গেলে ঘাতকরা ওই বাড়িতেই গোসল সেরে নেয়। প্রথমে সিদ্ধার্থ এবং পরে মুগ্ধ নিহতদের বাথরুমে গোসল করে। এরপর তারা ডাইনিং টেবিলে রাখা বৈয়াম থেকে খেজুর ও শসা খেয়ে তৃষ্ণা মেটায় এবং ওই ঘরে বসেই আবারও ইয়াবা সেবন করে। শুধু তাই নয়, অপরাধের সমস্ত আলামত মুছে ফেলার জন্য নিহতদের দুটি স্মার্টফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে চুবিয়ে রাখা হয়েছিল যাতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা হাতের ছাপ নষ্ট হয়ে যায়।
পুলিশের দ্রুত তৎপরতায় এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটিত হয়েছে এবং দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হবে। একই পরিবারের চার সদস্যকে এভাবে ঠান্ডা মাথায় হত্যার ঘটনায় পুরো রংপুরজুড়ে তীব্র শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।









