বাংলাদেশের গ্যাস সংকট এখন আবার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বড় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও গ্যাসের চাপ নেই, কোথাও শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কোথাও সার কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। আর এই সংকটকে ঘিরে শুরু হয়েছে পুরোনো সেই রাজনৈতিক খেলা। দায় চাপানো হচ্ছে আগের সরকারের ওপর, তারপর এমনভাবে গল্প বলে যেন গত দেড় দশকে এই দেশের জ্বালানি খাতে কিছুই হয়নি।
কিন্তু জ্বালানি খাতের ইতিহাস এত সহজে মুছে ফেলা যায় না। আর বিএনপির অতীত জ্বালানি রাজনীতির ইতিহাস তো আরও নয়। সেই ইতিহাসের একটি বড় নাম নাইকো।
২০০৫ সালে সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে নাইকোর খননকাজ চলার সময় ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। কয়েক মাসের ব্যবধানে ঘটে দুটি বিস্ফোরণ। বিপুল পরিমাণ মূল্যবান গ্যাস পুড়ে যায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় গ্যাসক্ষেত্র ও আশপাশের পরিবেশ। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর আন্তর্জাতিক সালিশি ট্রাইব্যুনাল শেষ পর্যন্ত নাইকোকেই প্রথম বিস্ফোরণের জন্য দায়ী করে। ২০২০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির দায় নির্ধারণী সিদ্ধান্তে ICSID ট্রাইব্যুনাল জানায়, নাইকো যৌথ উদ্যোগ চুক্তির অধীনে তাদের দায়িত্ব লঙ্ঘন করেছে এবং প্রথম বিস্ফোরণের জন্য দায়ী। (ICSID)
অর্থাৎ এটি কোনো আওয়ামী লীগ সরকারের বানানো গল্প নয়। এটি কোনো রাজনৈতিক মঞ্চের বক্তৃতাও নয়। আন্তর্জাতিক সালিশি ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত।
২০২০ সালের মে মাসে, করোনার ভয়াবহ সময়ের মধ্যে, তৎকালীন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এই রায়ের বিষয়টি জনগণের সামনে তুলে ধরেছিলেন। বাংলাদেশ তখন গ্যাসের ক্ষতি, পরিবেশগত ক্ষতি এবং অন্যান্য ক্ষতির জন্য প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিল। ট্রাইব্যুনাল নাইকোর দায় স্বীকার করে ক্ষতিপূরণের পথ খুলে দেয় এবং ক্ষতির মধ্যে পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের বিষয়ও বিবেচনায় নেয়।
পরবর্তীতে ক্ষতিপূরণের চূড়ান্ত অঙ্ক নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে চূড়ান্ত অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয় এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রায় ৪২ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ পাওয়ার নির্দেশ পায়। বাংলাদেশের দাবি ছিল প্রায় ১.০১৪ বিলিয়ন ডলার।
কিন্তু নাইকো মামলার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো টাকার অঙ্কে নয়। শিক্ষা হলো, বাংলাদেশকে দুর্বল ভেবে কেউ এ দেশে এসে যা খুশি করে পার পেয়ে যাবে—এই ধারণা ভুল।
২০২০ সালে নসরুল হামিদ বলেছিলেন, বাংলাদেশকে এমন একটি বার্তা দিতে হবে যে বিদেশি বিনিয়োগের নামে এসে কেউ যা ইচ্ছা তা করে যেতে পারবে না। সেই সময়ের একটি অনলাইন সেমিনারে তিনি বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশের দুর্নীতির আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির প্রসঙ্গ টেনে বলেছিলেন, নাইকো হয়তো ধরে নিয়েছিল বাংলাদেশে দুর্নীতি করে পার পাওয়া যাবে।
একসময় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হলেই আমরা ধরে নিতাম, তারা বড় কোম্পানি, তারা জানে কী করছে, তাদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কীভাবে লড়বে? কিন্তু শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে নাইকো মামলার দীর্ঘ লড়াই দেখিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশ চাইলে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নিজের স্বার্থের পক্ষে দাঁড়াতে পারে।
আর এখানেই আজকের গ্যাস সংকটের সঙ্গে নাইকোকে মিলিয়ে দেখা দরকার।
কারণ বিএনপি এখন যখন গ্যাস সংকটের জন্য গত ১৭ বছরকে দায়ী করে, তখন তাদের নিজেদের অতীতের জ্বালানি রাজনীতির হিসাবটাও সামনে আসা দরকার।
যে সময় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় ছিল, সেই সময় নাইকোর সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তিকে ঘিরে পরবর্তীতে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, যা আন্তর্জাতিক সালিশি প্রক্রিয়াতেও আলোচিত হয়েছে। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়েও নাইকোর সঙ্গে ২০০৩ সালের যৌথ উদ্যোগ চুক্তি এবং সেটিকে ঘিরে দুর্নীতি, ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়টি নথিভুক্ত হয়েছে।
আর সেই নাইকোই এমন একটি দুর্ঘটনা ঘটাল, যার ফলে দেশের মূল্যবান গ্যাস পুড়ে গেল। শুধু গ্যাসই নয়, সেই বিস্ফোরণের ক্ষতি গিয়ে পড়ল পরিবেশ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং দীর্ঘমেয়াদি জনজীবনের ওপর। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তেও গ্যাসের ক্ষতি, কার্বন নিঃসরণজনিত পরিবেশগত ক্ষতি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষতির বিষয়গুলো এসেছে।
তাহলে আজ যখন গ্যাস সংকট নিয়ে এত কথা হচ্ছে, তখন প্রশ্নটা শুধু এই নয় যে গত ১৭ বছরে কতটি কূপ খনন হয়েছে। প্রশ্ন হলো, তারও আগে যারা দেশের জ্বালানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল, তারা কী করেছে?
কোন চুক্তি করেছে? কাদের সঙ্গে করেছে? কী শর্তে করেছে? দেশের স্বার্থ কতটা রক্ষা করেছে?
আর সেই সিদ্ধান্তের কারণে দেশের ক্ষতি হলে তার দায় কে নেবে?
আজ বিএনপি যদি জ্বালানি সংকট নিয়ে প্রশ্ন তোলে, অবশ্যই তুলবে। একটি রাজনৈতিক দলের কাজই হলো সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কিন্তু জনগণের স্মৃতিকে এতটা ছোট করে দেখার সুযোগ নেই যে ইতিহাসের অস্বস্তিকর অধ্যায়গুলো মুছে দিয়ে শুধু গত ১৭ বছরের গল্প শোনানো হবে।
আর আওয়ামী লীগ সরকারও গ্যাস খাতে দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ রেখে যায়নি। অনুসন্ধানে আরও গতি প্রয়োজন ছিল, আরও বেশি কূপ খনন করা প্রয়োজন ছিল, দেশীয় গ্যাসের মজুত বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। এসব নিয়ে সমালোচনা হতে পারে, হওয়া উচিত। তবে সেসবের চেষ্টার কোন কমতি ছিলনা।
কিন্তু সেই সমালোচনা করতে গিয়ে যদি বলা হয় গত ১৭ বছরে একটি কূপও খনন হয়নি, অথচ জ্বালানি বিভাগের নথিতে ১৫৫টি কূপ খননের তথ্য থাকে, ছয়টি নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের তথ্য থাকে, হাজার হাজার কিলোমিটার সিসমিক জরিপের তথ্য থাকে, নতুন রিগ সংগ্রহের তথ্য থাকে, গ্যাস পাইপলাইন সম্প্রসারণের হিসাব থাকে, এলএনজি অবকাঠামো গড়ে ওঠার তথ্য থাকে—তাহলে প্রশ্ন উঠবেই।
এটি কি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য? নাকি জনগণকে একটি নির্দিষ্ট গল্প বিশ্বাস করানোর চেষ্টা?
আজকের গ্যাস সংকটের সমাধান অতীতকে গালমন্দ করে হবে না। আবার অতীতের ভুল অস্বীকার করেও হবে না। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হলো, সংকটের সমাধান করতে হলে সত্যটা স্বীকার করতে হবে।
কারণ গ্যাসের সংকট রাজনৈতিক স্লোগান বোঝে না। কারখানার চুল্লি দল দেখে জ্বলে না। সার কারখানা বিএনপি না আওয়ামী লীগ দেখে উৎপাদন শুরু করে না। বাসাবাড়ির চুলায় দলীয় পরিচয় অনুযায়ী গ্যাস আসে না। গ্যাস আসে যখন রাষ্ট্র সঠিক পরিকল্পনা করে।
গ্যাস আসে যখন অনুসন্ধান হয়। গ্যাস আসে যখন কূপ খনন হয়। গ্যাস আসে যখন অবকাঠামো তৈরি হয়। আর গ্যাসের সম্পদ রক্ষা হয় যখন রাষ্ট্র বিদেশি বিনিয়োগকারীর সঙ্গেও নিজের স্বার্থের প্রশ্নে শক্ত অবস্থান নেয়। নাইকো মামলার সবচেয়ে বড় অর্জন এখানেই।
বাংলাদেশ শুধু একটি আন্তর্জাতিক মামলায় জয় পায়নি। বাংলাদেশ দেখিয়েছে, এই দেশকে দুর্বল ভেবে নিজের ইচ্ছামতো আচরণ করার দিন শেষ। নাইকো ভেবেছিল হয়তো বাংলাদেশকে আইনি ও রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখা যাবে। শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালই তাদের দায় নির্ধারণ করেছে।
সেই শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে এলে বিদেশি কোম্পানিকে স্বাগত জানানো হবে। বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হবে। কিন্তু বাংলাদেশের সম্পদ নিয়ে যা খুশি করার সুযোগ দেওয়া হবে না। এই কথা এখন বিএনপিকে মনে রাখতে হবে। তারা যেন নাইকোর মত করে টাকার কাছে বিক্রী হয়ে আবার কোন দেশ বিরোধী চুক্তি না করে।
আর যারা আজ গ্যাস সংকট নিয়ে কথা বলছেন, তাদেরও মনে রাখা উচিত—বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাস ২০০৯ সালে শুরু হয়নি। এর আগেও সরকার ছিল। চুক্তি ছিল। বিদেশি কোম্পানি ছিল। গ্যাস ছিল। দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। আর নাইকোর মতো ক্ষতও ছিল।
সুতরাং আজকের সংকটের দায় খুঁজতে গিয়ে যদি ইতিহাসের অর্ধেকটা বাদ দেওয়া হয়, তাহলে সেটি ইতিহাসের বিশ্লেষণ হবে না, হবে রাজনৈতিক সুবিধামতো ইতিহাস লেখা।
নাইকো মামলার রায় সেই ইতিহাসের একটি স্থায়ী দলিল হয়ে থাকবে।
আর নসরুল হামিদ বিপুর সময়ের সেই লড়াইও মনে করিয়ে দেবে, এক দশক আগের বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশ এক নয়। সরকার বদলেছে। মন্ত্রী বদলেছে। ক্ষমতার সমীকরণ বদলেছে।
কিন্তু রাষ্ট্রের স্বার্থের প্রশ্নটি বদলায়নি। নাইকোর বিরুদ্ধে সেই লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় বার্তাটিও বদলায়নি—
বাংলাদেশের সম্পদ নিয়ে, বাংলাদেশের মানুষকে পাশ কাটিয়ে, বাংলাদেশের সঙ্গে যেনতেনভাবে দর-কষাকষি করে পার পাওয়ার দিন শেষ।
আজ যারা ক্ষমতায়, তাদের দায়িত্ব সেই অবস্থান আরও শক্ত করা। তা নাহলে ইতিহাসের কাঠগড়ায় আবারো তাদেরকে উঠতেই হবে। আর যারা বিরোধিতায়, তাদের দায়িত্ব সত্যকে বিকৃত না করে জবাবদিহি দাবি করা। কারণ গ্যাস সংকটের রাজনৈতিক লাভ হয়তো সাময়িক।
কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হয় পুরো দেশকে।









